কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা মৌজায় চলমান বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে-বিডিএস জরিপের তসদিক কার্যক্রমে গুরুতর অনিয়ম, হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট সহকারী সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আবু শাহীন আজাদের বিরুদ্ধে। ভূমি মালিকদের অভিযোগ, অফিস চলাকালীন বিভি-ন্ন খতিয়ানে ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে তাদের কাগজপত্র ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পরে একই ভূমি মালিক কথিত দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে অর্থের বিনিময়ে সেই খতিয়ানের কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ-অফিসে খতিয়ান আটকে দেওয়ার পর কথিত দালালরা ভূমি মালিকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রাতে আবু শাহীন আজাদের বাসায় গিয়ে খতিয়ানের কাজ সম্পন্ন করে দেন বলে দাবি করেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাদের ভাষ্য, এভাবে অফিসের নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে অর্থের
বিনিময়ে খতিয়ান সম্পন্ন করে ভূমি মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।ভূমি মালিকদের অভিযোগ, তসদিকের জন্য প্রয়োজনীয় দলিলপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট টেবিলে গেলে অনেক সময় খতিয়ান বা জমির কাগজপত্রে বিভিন্ন ধরনের ভুল-ত্রুটি দেখানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খতিয়ানে ‘ডিস্পোর্ট’ বা আপত্তি রয়েছে বলেও জানানো হয়। এরপর সমস্যা সমাধানের জন্য অফিসের বাইরে থাকা কথিত দালালদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, খতিয়ান বা পর্চা সত্যায়নের জন্য ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার, এক লাখ এমনকি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি করার ঘটনাও ঘটেছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে এক লাখ টাকা দেওয়ার পর কথিত ‘ডিস্পোর্ট’ তুলে খতিয়ান সত্যায়ন করে দেওয়া হয়েছে।
ঝিলংজা মৌজার ১৩, ২৮, ৩৯, ৫০, ৬৩, ৬৪, ৮২, ৮৮, ৮৯ ও ৯০ নম্বর সিট নিয়ে কয়েকজন ভূমি মালিক এমন অভিযোগ তুলেছেন।
ভূমি মালিকদের অভিযোগের নতুন ও গুরুতর অংশ হচ্ছে-অফিস চলাকালীন কোনো খতিয়ানে ভুল-ত্রুটি দেখিয়ে কাজ ফেরত দেওয়া হলেও পরে কথিত দালালদের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে সেটি সম্পন্ন করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, একই ভূমি মালিকের কাছ থেকে দালালরা টাকা সংগ্রহ করে রাতে আবু শাহীন আজাদের বাসায় নিয়ে যায় এবং সেখানে খতিয়ানের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তা ভূমি মালিকের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়।
তাদের প্রশ্ন-যে খতিয়ানে দিনের বেলায় সমস্যা দেখিয়ে কাজ ফেরত দেওয়া হচ্ছে, সেটিই যদি রাতে অর্থের বিনিময়ে সম্পন্ন হয়ে যায়, তাহলে সরকারি জরিপের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে?স্থানীয় এক যুবদল নেতা অভিযোগ করেন, তার মামা-শাশুড়ির জমির খতিয়ান সত্যায়নের জন্য প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে ৪৫ হাজার টাকা দেওয়ার পর খতিয়ান সত্যায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন ভূমি মালিক জহির আহমদ, নুরুল ইসলাম, ছৈয়দ, রফিক ও জসিম উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন।তাদের দাবি, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং বিভিন্ন কৌশলে ভূমি মালিকদের হয়রানি করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে।অভিযোগকারীদের দাবি, আবু শাহীন আজাদ সরাসরি টাকা গ্রহণ করেন না। তার টেবিলে কর্মরত পিয়ন-সহকারী পলাশ চন্দ্র মিস্ত্রি এবং অফিসের বাইরে থাকা কথিত দালালদের মাধ্যমে ভূমি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
রেজাউল, মাহবুব, উমর ফারুক ও উসমানসহ কয়েকজনের দালালের নাম উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, তারা ভূমি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।তাদের আরও অভিযোগ, ‘ডিস্পোর্ট’ বা বিবাদ ফর্মকে কেন্দ্র করে ভূমি মালিকদের মধ্যে ভয় তৈরি করা হয়। পরে সেই সমস্যা সমাধানের নামে অর্থ দাবিকরা হচ্ছে। আবু শাহীন আজাদের পূর্বের কর্মস্থল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভূমি মালিকদের একটি অংশ।
তাদের দাবি, ২০২৫ সালে কক্সবাজার সদর উপজেলার তেতোয়া মৌজার ডিপি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকালে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ওঠার পর আবু শাহীন আজাদকে কক্সবাজার থেকে বদলি করা হয়েছিল।
ভূমি মালিকদের প্রশ্ন-যদি তার বিরুদ্ধে পূর্বে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা বদলি হয়ে থাকে, তাহলে পুনরায় তাকে কক্সবাজারের ঝিলংজা মৌজার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিডিএস তসদিক কার্যক্রমে দায়িত্ব দেওয়া হলো কীভাবে?
ভূমি মালিকদের অভিযোগ, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্বে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও তাকে একই জেলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমি জরিপ কার্যক্রমে দায়িত্ব দেওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।তাদের দাবি, বিষয়টি শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবেনা দেখে তার দায়িত্ব পালনের পূর্ববর্তী রেকর্ড, বদলির কারণ এবং বর্তমান কার্যক্রম-সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত করা উচিত।
ভূমি মালিকদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-একটি খতিয়ানে ‘ডিস্পোর্ট’ বা আপত্তি কীভাবে যুক্ত হচ্ছে?কোন কর্মকর্তা এটি দিচ্ছেন? লিখিত কারণ কী? কে আপত্তি করছেন? সংশ্লিষ্ট ভূমি মালিককে কীভাবে জানানো হচ্ছে? আপত্তি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে শুনানি ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কী?
ভূমি মালিকদের দাবি, ঝিলংজা মৌজার যেসব খতিয়ানে ‘ডিস্পোর্ট’ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর লিখিত ও ডিজিটাল রেকর্ড যাচাই করা হলেই অনেক অভিযোগের সত্যতা পরিষ্কার হতে পারে।এই বিষয়ে আবু শাহিন আজাদ এর বক্তব্যের জন্য ফোন করা হলে, তিনি ফোন রিসিভ করেননি, কিছুক্ষণ পর
বিভিন্ন নাম্বার থেকে প্রতিবেদককে প্রতিবেদন না করার জন্য হুমকি দুমকি প্রদর্শন করে আসছিলেন।এই বিষয়ে, তল্লাশি কর্মকর্তা কামরুল হাসানের বক্তব্য নেওয়া হলে তিনি বলেন, অনিয়ম এবং ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই বিষয়ে, সেটেলমেন্ট অফিসার শামসুল আরফিনের বক্তব্য নেওয়া হলে তিনি বলেন। এই তথ্য আপনাদের মধ্য দিয়ে পেয়েছি। বিষয়টি আমরা যাচাই-বাছাই করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করাহবে। লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই বিষয়ে, মোঃ আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর, মহাপরিচাল ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর। এর বক্তব্য নেওয়া হলে তিনি বলেন, এই ধরনের অভিযোগের কারণে পূর্বে ও দুজনকে বদলি করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর মধ্য দিয়ে অভিযোগ পেলে সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর রাতের বেলায় তার বাসা থেকে অর্থের বিনিময়ে খতিয়ানের কাজ সম্পন্ন করার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। ভূমি মালিকদের দাবি, ঝিলংজা মৌজার বিডিএস তসদিক কার্যক্রমে ওঠা
অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করতে হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়েও কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-অফিসে যে খতিয়ানে ভুল দেখিয়ে ভূমি মালিককে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, সেই খতিয়ানের কাজই যদি রাতে অর্থের বিনিময়ে সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে এর নেপথ্যে আসলে কারা?এবং ২০২৫ সালের পূর্বের অভিযোগ ও বদলির বিষয়টি সত্য হলে, পুনরায় আবু শাহীন আজাদকে ঝিলংজা মৌজার গুরুত্বপূর্ণ তসদিক কার্যক্রমে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে কী ছিল-সেটিও এখন তদন্তের দাবি রাখে।
ভূমি মালিকদের প্রত্যাশা-ঝিলংজা মৌজার বিডিএস জরিপ হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দালালমুক্ত; জমির মালিকানা নির্ধারিত হবেদলিল, প্রমাণ ও আইনগত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে-কোনো ধরনের ভয়ভীতি, হয়রানি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নয়।