বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত ও স্মার্ট রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতুসহ অসংখ্য মেগা প্রকল্প দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি একটি বিষয় এখনও উদ্বেগজনকভাবে রয়ে গেছে, সেটি হলো সড়ক নিরাপত্তা। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন, অনেকে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন এবং অসংখ্য পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু যানবাহনের ত্রুটি বা সড়কের দুর্বল নকশাই দায়ী নয়, বরং সচেতনতার অভাব অন্যতম প্রধান কারণ। পথচারী, চালক, যাত্রী, এমনকি শিক্ষার্থীদের অনেকেই সড়ক ব্যবহারের মৌলিক নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। ট্রাফিক সিগন্যাল মানা, জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার, ফুটওভার ব্রিজে ওঠা, হেলমেট বা সিটবেল্ট ব্যবহার, গতিসীমা মেনে চলা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষের ধারণা সীমিত। এই বাস্তবতায় কেবল আইন প্রয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন ছোটবেলা থেকেই সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সুসংগঠিত শিক্ষা।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই উপলব্ধি করেছে যে নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে হলে সচেতন নাগরিক তৈরি করতে হবে। সেই কারণে অনেক দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয় পর্যায়ে ট্রাফিক আইন, নিরাপদ পথচলা, সাইকেল চালানোর নিয়ম, যানবাহনের ঝুঁকি এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে ব্যবহারিক শিক্ষা লাভ করে। ফলে তারা বড় হয়ে আইন মেনে চলা এবং অন্যদের নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হলে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়স থেকেই নিরাপদ আচরণের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে। বইয়ের একটি অধ্যায় যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক অনুশীলন, ট্রাফিক পুলিশের অংশগ্রহণে প্রশিক্ষণ, মক রোড ক্রসিং, বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে বিষয়টিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একজন শিক্ষার্থী যখন ছোটবেলা থেকেই শিখবে যে রাস্তা পারাপারের সঠিক নিয়ম কী, ট্রাফিক সিগন্যালের অর্থ কী, মোটরসাইকেলে হেলমেট কেন বাধ্যতামূলক, কিংবা চলন্ত যানবাহনে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তখন সে শুধু নিজেই সচেতন হবে না, পরিবার ও সমাজকেও সচেতন করবে। একটি শিশুর মাধ্যমে একটি পরিবার এবং একটি পরিবারের মাধ্যমে একটি সমাজে নিরাপদ সড়ক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের চালক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারক। তাই তাদের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক জ্ঞান ও মূল্যবোধ গড়ে তোলা মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ নির্মাণের ভিত্তি তৈরি করা। এই শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য নয়, বরং জীবন রক্ষার জন্য। একজন শিক্ষার্থী যদি এই শিক্ষার মাধ্যমে একটি দুর্ঘটনা এড়াতে সক্ষম হয়, তবে সেই শিক্ষার মূল্য কোনো পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি।
বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষাকে আরও কার্যকর করতে পারে। শ্রেণিকক্ষে ভিডিও, অ্যানিমেশন, ভার্চুয়াল সিমুলেশন, ট্রাফিক গেম, কুইজ এবং বাস্তব ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো সহজ ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। একই সঙ্গে বিদ্যালয় পর্যায়ে ‘রোড সেফটি ক্লাব (আরএসসি)’ গঠন করে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এসব ক্লাবের মাধ্যমে র্যালি, সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, পোস্টার প্রতিযোগিতা এবং নিরাপদ সড়ক বিষয়ক বিতর্ক আয়োজন করলে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন চর্চার অংশ হয়ে উঠবে।
শিক্ষাক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে কেবল একটি অধ্যায় সংযোজন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। বিষয়টিকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে এটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। এজন্য শিক্ষাক্রম প্রণয়নের সময় বয়সভিত্তিক বিষয়বস্তু নির্ধারণ করা জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে নিরাপদে রাস্তা পারাপার, ট্রাফিক লাইটের অর্থ, ফুটপাত ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার, স্কুলবাসে ওঠানামার নিয়ম এবং পথচারীর দায়িত্ব শেখানো যেতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ট্রাফিক আইন, যানবাহনের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিরোধ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নাগরিক দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সড়ক প্রকৌশল, পরিবহন ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা আইন, দুর্ঘটনার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যেতে পারে।
একটি বিষয়কে কার্যকরভাবে শেখানোর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক অপরিহার্য। তাই শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষ মডিউল যুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ট্রাফিক পুলিশ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, ফায়ার সার্ভিস, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বছরে অন্তত একবার প্রতিটি বিদ্যালয়ে ‘সড়ক নিরাপত্তা সপ্তাহ’ পালন বাধ্যতামূলক করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ ও সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, অ্যানিমেশন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (VR), সিমুলেশন, মোবাইল অ্যাপ এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ কুইজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাস্তব পরিস্থিতির অনুশীলন করতে পারবে। এতে তারা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করবে না, বাস্তব জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে, তার সঙ্গে এই উদ্যোগও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যেই সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। জাপানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বিদ্যালয়ে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সুইডেনের ‘ভিশন জিরো’ নীতির অন্যতম ভিত্তি হলো নাগরিকদের মধ্যে নিরাপদ সড়ক আচরণ গড়ে তোলা। যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশেও স্কুল পর্যায়ে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশেও নিরাপদ সড়ক চাইসহ (নিসচা) বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কাজ করে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা, মানববন্ধন, র্যালি, সেমিনার এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ‘নিরাপদ সড়ক চাইসহ (নিসচা)’ বিভিন্ন সংগঠনের নিরলস প্রচেষ্টায় সড়ক নিরাপত্তা এখন জাতীয় আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে এই উদ্যোগগুলোকে আরও টেকসই করতে হলে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সম্পৃক্ত করা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, শিশুরা বিদ্যালয়ে নিয়ম শিখলেও পরিবারে সেই নিয়মের চর্চা হয় না। অভিভাবক যদি মোটরসাইকেলে হেলমেট ছাড়া চলাচল করেন, চলন্ত বাসে ওঠানামা করেন বা ট্রাফিক আইন অমান্য করেন, তাহলে শিশুর ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই বিদ্যালয়ভিত্তিক অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচিরও ব্যবস্থা করা উচিত।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে বিপুল ক্ষতি হয়। চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানো, উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া এবং পরিবারের আর্থিক সংকট জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানি নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া। তাই সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা ব্যয় নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি লাভজনক বিনিয়োগ।
বর্তমান সরকার নিরাপদ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগ, উন্নত সড়ক নির্মাণ, দক্ষ চালক তৈরি এবং শিক্ষার মাধ্যমে সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এই চারটি বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হলেই দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা জরুরী। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জীবন রক্ষার শিক্ষা। শিক্ষার্থীরা যদি ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের সংস্কৃতি অর্জন করে, তাহলে ভবিষ্যতে একটি আইন মেনে চলা, দায়িত্বশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে উঠবে। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের নাগরিককে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ নিরাপদ সড়ক কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং একই সঙ্গে সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আজকের শিক্ষার্থীদের হাতে যদি আমরা নিরাপদ সড়কের শিক্ষা তুলে দিতে পারি, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে আরও নিরাপদ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং মানবিক। সড়ক দুর্ঘটনামুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় শিক্ষাক্রমে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।