প্রান্তিক জনসাধারণের হাতের নাগালে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্বাস্থ ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র মানুষের মৌলিক চিকিৎসা সেবা, স্বাস্থ্য পরামর্শ, মাতৃত্ব কালিন সেবা, পরিবার পরিকল্পনা সহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়া হয়ে। কিন্তু ৬নং দক্ষিণ রণিখাই ইউ/পি সুন্দাউরা গ্রামে অবস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেটিতে দেখা গেল ভিন্নরূপ।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির পিছনের বিল্ডিংয়ের ভিতরে ও আশেপাশে বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ভারতীয় মদ, বিয়ার ও ফেনসিডিলের খালি বোতল ও ক্যান এবং সিগারেটের প্যাকেট ও কার্টুন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারিপাশে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পরিবেশ নষ্ট করে কেন্দ্রটিকে মাদক সেবনের আখড়ায় পরিণত করেছে কতিপয় মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু রাতে নয় দিনের আলোতে প্রকাশ্যে মাদক সেবন চলে প্রভাবশালী ও এলাকার মানুষের সহযোগিতায়। মাদক সেবনে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া এসব ব্যক্তি ও প্রভাবশালীর সম্পৃক্ততার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পায় না।
এসব আলামত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের নির্জন অংশে নিয়মিত মাদক সেবনের কার্যক্রম চলে আসছে।
এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির তিন দিক সীমানা প্রাচীর থাকলে ও সামনের অংশ খোলা অবস্থায় রয়েছে। কেবলমাত্র পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ছাড়া অন্য কর্মকর্তা বা কর্মী নেই। এমন কি একজন পিওন অথবা নৈশ প্রহরী ও নেই। ভবনগুলো দীর্ঘদিনের পুরোনো, বাজ্যিক দিক রং করা, কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ, যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে দাবি করেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
স্থানীয়রা জানান, স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারী, শিশু ও বয়স্ক রোগীরা এমন পরিবেশে বিব্রত ও আতঙ্কিত বোধ করেন। ফলে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সেবার মানও ব্যাহত হচ্ছে। তাই, প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ চান তারা।
ইউনিয়ন বিএনপি উপদেষ্টা (স্থানীয়) উসতার আলী বলেন, রাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে মাদক সেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়, স্থানীয় খাগাইল বাজার বা হায়দরি বাজারে যত মানুষ থাকে, প্রায় সমসংখ্যক মাদকসেবী রাতে সেখানে আসে এবং স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শহর থেকে মাদক সেবিরাও আসে।
ইউপি সদস্য আলী হোসেন বলেন, আমরা চাই প্রশাসন মাদকের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। মাদক নির্মূল না হলে আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে এবং এলাকার যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) বদরুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রে একজন পরিদর্শিকা একাই দায়িত্ব পালন করছেন, অন্য কোনো জনবল নেই। অনেক সময় মাতালদের উৎপাত ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁকে দরজায় তালা লাগিয়ে ডিউটি করতে হয়। আমি কোম্পানীগঞ্জে অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছি, তাই প্রতিদিন সেখানে যাওয়া সম্ভব হয় না। এই এলাকা মাদকমুক্ত করতে উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিষয়টি প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) সুজন চন্দ্র কর্মকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি জানান, আমরা একদিন পর পর টহল দিলে মাদক সেবন এমনকি ব্যবাসা করতে পারবেনা। যেহেতু সাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এলাকা তাই আমাদের ডিউটি পুলিশের টহল অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রবিন মিয়া বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অবস্থান কঠোর। এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের অনুমোদিত ৪২টি পদের মধ্যে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৩টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। তবে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বর্তমানে এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতি ইউনিয়নে ৪ থেকে ৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও কোনো কোনো এলাকায় প্রায় এক যুগ ধরে প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের মধ্যে ২নং পূর্ব ইসলামপুর ও ৫নং উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে এখনও স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। ফলে ওইসব এলাকার বাসিন্দারা পরিবার পরিকল্পনার সহায়ক ওষুধ ও সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এতে অনাকাক্সিক্ষত জন্মহার বৃদ্ধির আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত নজরদারি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে এলাকার সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের মতে, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে আগে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।