কাঁঠালের রাজধানী গাজীপুর জেলার সদর উপজেলা চত্বরে জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গাজীপুরের যৌথ আয়োজনে ‘ফল মেলা-২০২৬’ এবং কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
গত শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো: নূরুল করিম ভূঁইয়ার সাথে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে এই মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
এবারের মেলায় বৈচিত্র্যময় দিক হলো এতে দেশীয় ফলের সমাহার ঘটেছে, যেখানে মোট ৩৪ রকমের ফল প্রদর্শন করা হয়। মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছিলো গাজীপুরের একটি ঐতিহ্যবাহী ও বিশাল আকৃতির — ৩৫ কেজি ওজনের কাঁঠাল, যা ভিডিও কনফারেন্সে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে প্রদর্শন করা হয়। এসময় জেলা প্রশাসক মন্ত্রীকে জানান, কাঠাল ও কাঁঠালজাত পণ্য আমরা বিদেশে রপ্তানির চেষ্টা করছি। আমাদের এই কাঁঠালের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি বাজার রয়েছে। কাঠালকে প্রক্রিয়াজাত করে সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারলে ২০০০ কোটি টাকার একটি বাজার তৈরি হবে। এসময় তিনি মন্ত্রীকে গাজীপুরে কাঁঠালের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার জন্য উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেন। বিশাল এই কাঁঠাল দেখে মন্ত্রী গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী ফল কাঁঠালের বাম্পার উৎপাদনে অত্যন্ত প্রীত হন এবং এই কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার ও এর প্রচার-প্রসার বাড়াতে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর মাধ্যমে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় প্রচারের প্রতিশ্রুতি দেন।
গাজীপুরের ভাওয়ালগড়ের উঁচু লাল মাটি এবং এখানকার চমৎকার আবহাওয়া কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার লাল মাটিতে থাকা বিশেষ পুষ্টি উপাদান এবং পানি নিষ্কাশনের চমৎকার প্রাকৃতিক ব্যবস্থার কারণেই গাজীপুরের কাঁঠাল আকারে যেমন বিশাল হয়, তেমনি স্বাদেও অনন্য ও মিষ্টি হয়ে থাকে। জেলা প্রশাসক তাঁর বক্তব্যে ফল মেলার প্রয়োজনীয়তা ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ফল মেলা অত্যন্ত দরকারী একটি আয়োজন। এদেশের মানুষ আস্তে আস্তে নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে যাচ্ছে। এই ফল মেলার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে দেশীয় ফলের সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ও চেনানো; যাতে এই ফলগুলো আরও বেশি ব্যবহার হয় এবং মানুষ এগুলোর পুষ্টিগুণ ও গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে পারে। এর পাশাপাশি যাতে করে এই ফলগুলো ব্যবহার করে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারি। তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বদেশীয় ফুল, ফল ও গাছপালাকে সংরক্ষণ ও ধারণ করতে হবে। আমরা যাতে আমাদের অরিজিন বা রুটকে (শেকড়) হারিয়ে না ফেলি, সেজন্য এগুলোকে টিকিয়ে রাখা ও সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
উল্লেখ্য, গাজীপুর জেলায় এ বছর মোট ৯,১২৫ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে এবং মোট ফলন হয়েছে ২,৪০,০০০ মেট্রিক টন।
গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ সাজ্জাত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন মোঃ রফিকুল ইসলাম খান, উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গাজীপুর; মঈন খান এলিস, সহকারী কমিশনার (ভূমি), সদর, গাজীপুর; ড. মোঃ আবদুল্লাহ আল ফারুক, জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গাজীপুর; আবদুল মতিন বিশ্বাস, অতিরিক্ত উপপরিচালক, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, গাজীপুর।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় পরিবেশের উন্নয়ন ও ফলদ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও কৃষক পর্যায়ে এদিন বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। মেলার উদ্বোধনী দিনে মোট ৬০ জন প্রান্তিক কৃষকের মাঝে এই প্রণোদনা বিতরণ করা হয়। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অনুষ্ঠানে কৃষকদের মাঝে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্ট (জৈব সার) বিতরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর অধীনে প্রত্যেক কৃষককে—
৫টি করে উন্নত জাতের গাছের কলম চারা, ৫টি করে বাঁশের খুঁটি এবং ৪০ কেজি করে পরিবেশবান্ধব ভার্মি কম্পোস্ট (কেঁচো সার) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। বৈচিত্র্যময় এই ফল মেলা এবং সরকারি প্রণোদনা কর্মসূচি গাজীপুরের ফল চাষ ও সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে অনুষ্ঠানে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।