সামুদ্রিক প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, জেলে সংগঠন ও স্থানীয় অংশীজনদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত বুধবার (১২ আগস্ট) বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে “সামুদ্রিক প্রতিবেশ সংরক্ষণে সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ও দায়িত্ব” শীর্ষক অবহিতকরণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। ফিশনেট প্রকল্পের আওতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উত্তরণ-এর বাস্তবায়নে এবং Ocean Grants Programme ও UK International Development-এর আর্থিক সহযোগিতায় কর্মশালাটি আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান। সভাপতিত্ব করেন রাঙ্গাবালী উপজেলা সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অঃদাঃ) মোঃ জহিরুন্নবী। অনুষ্ঠানে অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ ইলিয়াছ, মাধ্যমিক শিক্ষা সুপারভাইজার অনাদি কুমার বাহাদুর, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা, বন বিভাগের প্রতিনিধি, উপজেলা ভূমি কমিটির সভাপতি, বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন ফেডারেশনের সভাপতি, উপজেলা নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালার শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ জহিরুন্নবী কর্মশালার উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন। পরে উত্তরণ-ফিশনেট প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, চলমান কার্যক্রম এবং স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও চাহিদা মূল্যায়ন (Need Assessment) প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন ফিশনেট প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার শাহাজাহান আলী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান উত্তরণ ও ফিশনেট প্রকল্পের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, সামুদ্রিক প্রতিবেশ রক্ষা ও অবৈধ মৎস্য আহরণ বন্ধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এর জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, জেলে সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি অবৈধ জাল ব্যবহার, নিষিদ্ধ মাছ শিকার এবং বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার মতো ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, টেকসই মৎস্য আহরণ, জেলেদের অধিকার ও নিরাপত্তা এবং মৎস্য আইন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ জহিরুন্নবী বলেন, প্রকৃত জেলেদের যাচাই-বাছাই করে জেলে কার্ডের আওতায় আনতে হবে, যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে প্রকৃত জেলেদের কাছে পৌঁছায়। সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া প্রতিটি ট্রলারে বৈধ লাইসেন্স এবং জেলেদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে অবৈধ জাল ও বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা বন্ধে কোস্ট গার্ড, নৌ-পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, জেলে সংগঠন ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত সহযোগিতা কামনা করেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু অবৈধ ও ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরার কারণে মাছের প্রজনন, ছোট মাছ ও পোনা এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাঁরা আরও বলেন, শুধু অভিযান ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রকৃত জেলেদের সরকারি সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মৎস্য আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, জেলে সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত সমন্বয় ও নজরদারি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
কর্মশালায় বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য অংশীজন স্থানীয় জেলেদের সমস্যা, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তাঁরা অবৈধ মৎস্য আহরণ প্রতিরোধ, প্রকৃত জেলেদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং সরকারি সেবার কার্যকর বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে আরও শক্তিশালী সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
আলোচনা শেষে সামুদ্রিক প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃত জেলেদের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, জেলে সংগঠন ও স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন এস কে রুশায়েদ উল্লাহ, এরিয়া ম্যানেজার, ফিশনেট প্রকল্প, উত্তরণ, রাঙ্গাবালী।