নীলফামারীর সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর সিলগালা করা গুদাম থেকে প্রশাসনের জব্দ করা প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ৯৯ মেট্রিক টন নিষিদ্ধ কীটনাশক উধাওয়ের ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে।ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ।মঙ্গলবার (১১ আগষ্ট)সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তদন্ত কমিটির সদস্যরা গুদামসহ আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।
তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন বিসিকের পরিচালক আরিফুল হক।কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন জেনারেল ম্যানেজার ফরহাদ হোসেন ও সারোয়ার হোসেন।তদন্তকালে নীলফামারীর উপপরিচালক নুরেল হক, সৈয়দপুর শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান, সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম মিন্টু, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষণ, থানার এসআই ঋষিকেশ চন্দ্র বর্মণ ও এসআই মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৪ সালের ২৫ জুন সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে একটি গুদাম থেকে সরকার নিষিদ্ধ এসিআই কোম্পানির‘বিফার ৫ জি’ বালাইনাশক গোপনে সরিয়ে নেওয়ার সময় প্রশাসন অভিযান চালায়।এ সময় একটি ট্রাকে বোঝাই এবং গুদামে মজুত থাকা মোট ৯৯ মেট্রিক টন কীটনাশক জব্দ করা হয়।অভিযান শেষে ট্রাক থেকে কীটনাশক নামিয়ে গুদামে রেখে তা সিলগালা করে দেওয়া হয়।অভিযানে নেতৃত্ব দেন সৈয়দপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা,র্যাব ও পুলিশ সদস্য এবং সংবাদকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এসিআই কোম্পানির সৈয়দপুর উপজেলা ডিলার মেসার্স মনোয়ার ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনোয়ার হোসেন সরকারকে আটক করা হয়।তিনি এ মামলায় ৫৬ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হন।মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।জব্দ করা কীটনাশকের গুদামের সিলগালা তালার চাবি মামলার বাদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীমান ভূষণের জিম্মায় রাখা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে গত ২৯ জুলাই।আদালতের নির্দেশে নীলফামারীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব হাসান সৈয়দপুর বিসিকের ওই গুদামে রক্ষিত নিষিদ্ধ কীটনাশক ধ্বংস করতে যান।বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে গুদামে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান,জব্দ করা বিপুল পরিমাণ কীটনাশকের প্রায় সবই নেই।গুদামের মেঝেতে পড়ে ছিল মাত্র ১২৩টি এক কেজির প্যাকেট।সেগুলোর কয়েকটি ছিল ছেঁড়া,ফাটা ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অবস্থায়।পরে অবশিষ্ট কয়েকটি প্যাকেট বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমানের জিম্মায় রেখে গুদামটি পুনরায় তালাবদ্ধ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে,উধাও হওয়া কীটনাশক চুরির পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হওয়ার আলামত লক্ষ্য করা গেছে।জব্দ করা কীটনাশকের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মেসার্স মনোয়ার ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মনোয়ার হোসেন সরকারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,জব্দ করা মালামাল সিলগালা করা ছিল।কে বা কারা কীটনাশক সরিয়েছে,তা তিনি বলতে পারছেন না।
সিলগালা করা গুদাম থেকে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কীটনাশক উধাওয়ের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।পরে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।এর পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।মঙ্গলবার তদন্ত কমিটি সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে গুদামটি পরিদর্শন করে।একই সঙ্গে আশপাশের অন্যান্য গুদাম ও এলাকা ঘুরে দেখে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে।তদন্ত শেষে কমিটির প্রধান বিসিকের পরিচালক আরিফুল হক সাংবাদিকদের বলেন,সার্বিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছি এবং সরাসরি সবকিছু দেখেছি। এসব পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।তবে সিলগালা করা গুদামে সংরক্ষিত ৯৯ মেট্রিক টন নিষিদ্ধ কীটনাশক কীভাবে উধাও হলো,কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং সিলগালা ও চাবির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।তদন্ত প্রতিবেদনেই এসব প্রশ্নের জট খোলার অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা।