৫ আগস্ট—বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও আলোচিত দিন। এই দিনটি ঘিরে জাতীয় পর্যায়ে নানা স্মরণ, আলোচনা ও মূল্যায়নের চর্চা হয়ে থাকে। অথচ দুঃখজনকভাবে, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর এই দিনটি ঘিরে কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি লক্ষ্য করা যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ, স্মরণসভা বা আলোচনা অনুষ্ঠান। একইভাবে ছাত্ররাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও উল্লেখযোগ্য কোনো আয়োজন চোখে পড়েনি। আরও বিস্ময়ের বিষয়, পুরো জুলাই মাস পেরিয়ে গেলেও জুলাইকে ঘিরে—যা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়—বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো স্মরণ, আলোচনা কিংবা একাডেমিক কর্মসূচির আয়োজন হয়নি।
প্রশ্নটি তাই আরও গভীর হয়ে ওঠে—কেন এই নীরবতা? এটি কি পরিকল্পনার অভাব, নাকি দায়িত্ববোধের ঘাটতি, নাকি বৃহত্তর কোনো উদাসীনতার প্রতিফলন?
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ইতিহাসচর্চা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং জাতীয় চেতনা গঠনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও সময়গুলোকে স্মরণ করা, সেগুলো নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও সমালোচনার পরিবেশ তৈরি করা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে একটি সচেতন ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে। সেই দায়িত্বের জায়গায় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নীরবতা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক এবং প্রশ্নবিদ্ধ।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এ নিয়ে খুব একটা প্রশ্নও উঠছে না। যারা সাধারণত বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক ইস্যুতে সোচ্চার থাকেন, তাঁদের অনেককেই এ বিষয়ে নীরব দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীসমাজ, শিক্ষকগণ, ছাত্রসংগঠন এবং সুশীল সমাজ—সবার কাছ থেকেই এ বিষয়ে একটি দায়িত্বশীল, স্পষ্ট ও সক্রিয় অবস্থান প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠছে।
সমালোচনার উদ্দেশ্য কখনোই কাউকে ব্যক্তিগতভাবে ছোট করা নয়; বরং একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি সচেতন দৃষ্টান্ত তৈরি করা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় যদি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিনগুলো যথাযথভাবে স্মরণ না করে, তবে তা শুধু একটি আয়োজনের অভাব নয়—বরং ইতিহাসচর্চা ও মূল্যবোধ গঠনের প্রক্রিয়ায় একটি শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক।
আমরা আশা করি, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রসংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলো যথাযথ মর্যাদা, গুরুত্ব ও একাডেমিক গভীরতার সঙ্গে পালন করবে। ইতিহাসকে বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ দেওয়া যায় না। নীরবতা কখনো কখনো একটি অবস্থান হয়ে দাঁড়ায়; কিন্তু ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সেই নীরবতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।