বাহির থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ সরকারি অফিস বলেই মনে হবে। সাইনবোর্ডও তেমনই জানান দেয়। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলেই দৃশ্যটি বদলে যায়। অফিস কক্ষের পাশাপাশি রয়েছে সুসজ্জিত বিশ্রামকক্ষ, বিছানা, রান্নাঘরের সরঞ্জাম ও নিয়মিত রান্নাবান্নার আয়োজন। সব মিলিয়ে সরকারি কার্যালয়টি যেন পরিণত হয়েছে একটি আবাসিক ভবনে।
সম্প্রতি লালমনিরহাট জেলার বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)-এর আঞ্চলিক কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থেকে শুরু করে নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত একাধিক ব্যক্তি নিয়মিত অফিসেই অবস্থান ও রাত্রিযাপন করেন।
জানা গেছে, নিজস্ব ভবন না থাকায় তিন বছর আগে একটি দুইতলা ভবন ভাড়া নিয়ে বিএমডিএর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। নিচতলায় সরকারি মালামাল সংরক্ষণের জন্য একটি স্টোররুম থাকলেও সেখানে দেখা গেছে বিছানা, রান্নার সরঞ্জাম ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী। ওই কক্ষেই অবস্থান করেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খাইরুল ইসলাম। সদর দপ্তরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি জেলা কার্যালয়ের হিসাব শাখাও দেখভাল করেন।
দোতলায় রয়েছে হিসাবরক্ষকের কক্ষ, নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর এবং তার পাশেই থাই গ্লাস দিয়ে ঘেরা একটি সুসজ্জিত বিশ্রামকক্ষ। অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হুদা যোগদানের পর থেকেই ওই কক্ষে অবস্থান ও রাত্রিযাপন করছেন। তার খাবার প্রস্তুতের জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত একজন কর্মী নিয়মিত রান্নার কাজ করেন, যার বেতন সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়।
এছাড়া অফিসে নির্বাহী প্রকৌশলীর দেখভালের জন্য মাস্টার রোলে আরও তিনজন অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা পালাক্রমে দিন-রাত দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে বগুড়া পর্যন্ত ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে।
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম বলেন, “অফিসটি তিন বছর আগে ভাড়া নেওয়া হয়েছে। স্যার মাঝে মাঝে ভেতরের কক্ষটি রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি বাসা ভাড়া নেননি। যেদিন অফিস করেন, সেদিন এখানেই থাকেন। রান্নার জন্য একজন খালা আছেন। খাইরুল ইসলামও বাসা না নিয়ে নিচতলায় থাকেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ক্যাশ শাখা দেখভাল করেন।”
অস্থায়ী কর্মচারী মিঠুন চন্দ্র রায় বলেন, “আমরা চারজন অস্থায়ী কর্মী পালাক্রমে দিন-রাত ডিউটি করি। স্যারের কক্ষের পাশের রুমেই তার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নিচের রুমে অ্যাকাউন্টেন্ট থাকেন।”
রান্নার দায়িত্বে থাকা অস্থায়ী কর্মী ময়না বেগম বলেন, “আমি অফিসে রান্না করি। মিটিং থাকলে কিংবা স্যারের প্রয়োজন হলে খাবার রান্না করতে হয়। ওপরের রুমে স্যার বিশ্রাম নেন এবং রাতে ঘুমান।”
অফিসের সামনের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মানিক মিয়া জানান, খাইরুল ইসলাম ও ময়না বেগম প্রায়ই তার দোকান থেকে শাকসবজি ও অন্যান্য বাজারসামগ্রী কিনে অফিসে নিয়ে যান। নির্বাহী প্রকৌশলী যোগদানের পর থেকেই এ কেনাকাটা চলছে।
মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খাইরুল ইসলাম বলেন, “আমি এখন ছুটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আছি। আগে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। পরে স্যার আমাকে বাসা ছেড়ে অফিসে থাকতে বলেন। আমি থাকতে চাইনি, কিন্তু স্যারের নির্দেশেই সেখানে থাকি এবং রান্না করে খাই।”
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী, সরকারি অফিস কক্ষ বা চত্বর কোনোভাবেই স্থায়ী বসবাসের স্থান নয়। অফিসে রান্নাবান্না, শোবার ব্যবস্থা কিংবা অনুমোদনহীন রাত্রিযাপন সরকারি সম্পদের ব্যবহারবিধির পরিপন্থী। এছাড়া অফিসে রান্নার চুলা ব্যবহার অগ্নিঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালমনিরহাট বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হুদা বলেন, “আমরা ভূমি বরাদ্দের আবেদন করেছি। আপাতত ভাড়া ভবনে অফিস পরিচালনা করছি। জনবল সংকট থাকায় অফিস পাহারার জন্য কয়েকজনকে মাস্টার রোলে রাখা হয়েছে।”
থাকা ও রান্নার বিষয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি এমন নয়। দূর থেকে কোনো কর্মকর্তা এলে বা রাত হয়ে গেলে তাদের থাকার জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওপরের ও নিচের বেডরুমগুলো আমার নয়, অতিথিদের জন্য। আমি এখানে থাকি—এটি সঠিক নয়। তবে দুপুরে বাইরের হোটেলের খাবার না খেয়ে অফিসেই রান্না করে খাই।”
তবে সরকারি অফিসে আবাসিক ব্যবস্থা চালুর কোনো সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না—এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাব তিনি দেননি।
উল্লেখ্য, কৃষকদের সেচ সুবিধা ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২৩ সালে কুড়িগ্রাম থেকে পৃথক করে লালমনিরহাটে বিএমডিএর জেলা কার্যালয় চালু করা হয়। তবে সরকারি কার্যালয়ের এমন ব্যবহারের অভিযোগ স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।