কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথমেই ঢুকলে চোখে পড়ে মানুষের ভিড়, সারি সারি বাঁশ ও ত্রিপলের ঘর, আর জীবন বাঁচানোর অবিরাম সংগ্রাম। কিন্তু এই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি সংকট, যা প্রতিদিন বড় হচ্ছে নীরবে। সেটি হলো কঠিন বর্জ্য বা ময়লা–আবর্জনার সংকট। মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি এটি এখন পরিবেশগত উদ্বেগেরও বড় কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতিগুলোর একটিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা শুধু ক্যাম্প নয়, আশপাশের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও প্রভাবিত করে।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৪০ টনের বেশি কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই বর্জ্যের বড় অংশই প্লাস্টিক, পলিথিন, খাদ্যবর্জ্য, কাগজ ও অন্যান্য গৃহস্থালি আবর্জনা। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় অল্প জায়গায় বিপুল বর্জ্য জমা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। (UNDP, 2025; Community Partners International, 2025)
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্জ্যের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। প্লাস্টিক ও পলিথিন ড্রেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়, ফলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এসব বর্জ্য ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাটিতে মিশে যায়, যা মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস, মাটির গঠন পরিবর্তন এবং খাদ্য শৃঙ্খলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। (EEL Baseline Survey, 2024; CPI, 2025)
স্থানীয় কৃষকরাও এই সংকটের বাইরে নন। ক্যাম্পসংলগ্ন অনেক এলাকায় বৃষ্টির সময় বর্জ্য ও কাদা নেমে কৃষিজমিতে জমা হয়। ড্রেন ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়, ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়। পরিবেশবিদদের মতে, এটি শুধু বর্তমানের সমস্যা নয়; ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। (UNDP Environmental Impact Assessment, 2018; NRC, 2026)
পানিসম্পদের ওপরও চাপ বাড়ছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ফলে মাটি ও পানিদূষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, ল্যান্ডফিল বা বর্জ্যের স্তূপ থেকে নির্গত দূষিত তরল পদার্থ নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে তা ভূগর্ভস্থ পানির জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। (ReliefWeb-UNDP Environmental Impact Report, 2018; UNDP Bangladesh, 2025)
বর্জ্য সংকটের আরেকটি দিক হলো জনস্বাস্থ্য। ময়লার স্তূপে মাছি, মশা ও রোগজীবাণু সহজে জন্ম নেয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ড্রেন বন্ধ হয়ে গেলে পানি জমে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আজ শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য রক্ষারও অন্যতম শর্ত। (CPI, 2025; UNDP Bangladesh, 2025)
তবে ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। ২০১৮ সালে ক্যাম্প ২০ এক্সটেনশনে প্রথম স্যানিটারি ল্যান্ডফিল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু হয়। বর্তমানে সেখানে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন ল্যান্ডফিল নির্মাণ, পুনর্ব্যবহার উদ্যোগ এবং জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট উৎপাদনের কার্যক্রমও চলছে। (UNDP Bangladesh, 2025; UN Bangladesh, 2025)
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (NRC) ও অন্যান্য সংস্থা বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট তৈরি করে ক্যাম্পের সবুজায়ন ও ক্ষুদ্র কৃষিকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে বর্জ্যের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব সমাধানের পথ তৈরি হচ্ছে। তবু বাস্তবতা হলো, উৎপন্ন বর্জ্যের পরিমাণ এখনও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে এই অবকাঠামো টিকিয়ে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই গবেষকরা উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। (EEL Survey, 2024; UNDP, 2025)
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ময়লা তাই শুধু একটি নোংরা পরিবেশের ছবি নয়; এটি একটি অদৃশ্য দুর্যোগের দৃশ্যমান স্তূপ। মানবিক আশ্রয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের অব্যবস্থাপিত বর্জ্য আগামী দিনের পরিবেশগত বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। মানবতা ও পরিবেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং পাশাপাশি রেখে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মোহাম্মদ হাসেম
বি.এ এবং এম.এ (দর্শন), এমএসসি (পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা), এম.এস.এস (জনপ্রশাসন)।
উন্নয়নকর্মী