এস এম জহিরুল ইসলামঃ
যাদের বাড়ী বরিশাল জেলার মুলাদী উপজেলায় তাদের অনেকেই আমার দাদা ইয়াসমিন সরদারের কাগজী লেবুর গল্প শুনেছেন। আর যাদের বাড়ী চরকালেখান ইউনিয়নে তারা আমার দাদার গাছের কাগজী লেবু খাননি এমন মানুষ কমই আছে।
তখন বর্তমানে মুলাী- মৃধারহাট সড়কটি ছিল না। আমাদের বাড়ীর সামনের রাস্তাটি ছিল মৃধারহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক। মুলাদী বন্দরে যাওয়ার এই এলাকার মানুষের এটিই ছিল একমাত্র রাস্তা।
দাদা ছিলেন একটু জিদি মানুষ। কোথাও ভাল কোন ফলজ, বনজ বা ঔষধী গাছ দেখলে সেটি তার ফলাতেই হবে। সেই ধারাবাহিকতায় দাদা বাড়ির উঠানে লেবু গাছের চারা লাগালেন। চারাটি কোথা থেকে কলম করে এনেছিলেন তা অবশ্য মনে নেই। অন্যান্য ফলের গাছ তো বাড়ীতে যথারীতি ছিলই। দাদার পরম যত্নে লেবু গাছ চারদিকে ডালপালা ছড়িয়ে বড় হতে লাগল।
এক সময় লেবু দিতে শুরু করল গাছটি। লেবু একটু বড় হতেই এর ঘ্রান ছড়িয়ে পরতে লাগল। লেবুর ঘ্রান বাড়ির গন্ডি পেড়িয়ে রাস্তা পর্যন্ত চলে গেল। পথচারীদের কৌতুহল শুরু হলো কিসের এত সুন্দর ঘ্রান। সবাই বাড়ীতে ভীড় করতে শুরু করল লেবু ও গাছ দেখতে। দাদা ভীড় জমানো মানুষের জন্য বসা ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন। মুড়ি চিড়া ও নারিকেল ছিল মেহমানদারির মুল উপাদান। দেখতে আসা মানুদের দাদা লেবু উপহার দিয়ে দিতেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে লেবু গাছে এত লেবু হত যে কখনই লেবু শেষ হত না। মানুষ তখন বলাবলি করত আল্লাহর কুদরতী লেবু গাছ। গাছটিতে ১২ মাসই সমানভাবে লেবুর ফলন হতো। আমাদের আত্মীয় স্বজনসহ পথচারীরা লেবু সারা বছর খেলেও গাছের লেবু শেষ হত না। লেবুর রসে ছিল আলাদা স্বাদ। এত রসালো ছিল যে, লেবু দেখলে মনে হতো রসে ফেটে যায়। দাদার কাছে চাইলে সবাইকে সে নিজ হাতে ছিড়ে লেবু দিত। মানুষের কাছে দাদার লেবুর গল্প শুনে মানুষ দুর দুরান্ত থেকে লেবু নিতে আসত। প্রথম সেই গাছটি থেকে দাদা ডাল কলম করে আরও কয়েকটি লেবু গাছ লাগালেন। এক সময় আমাদের বাড়িতে হয়ে গেল একটি লেবুর বাগান। সকলের চাহিদা মিটিয়ে এক সময় আমরা বাজারে নিয়ে লেবু বিক্রি করতাম। অন্যরা ৫০ পয়সা হালি লেবু বিক্রি করলেও আমরা বিক্রি করতাম ২ টাকা এক হালি। তাও মুহুর্তেই শেষ হয়ে যেত। কারন আমার দাদার গাছের কাগজী লেবুর ভিন্ন স্বাদ।
এক সময় মানুষ দাদাকে না বলে রাতের অন্ধকারে লেবু নিতে শুরু করল। তখন বিদ্যুৎ না থাকায় নিরাপত্তার কোন ব্যবস্থা ছিল না। লেবু রক্ষার জন্য গাছের সাথে টিনের ঘন্টা বেঁধে মাঝে মাঝে দাদা তা বাজাতেন যাতে মানুষ বুঝে ঘরের মানুষ এখন সজাগ আছে। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। মানুষ না বলে লেবু নিতই।
আমরা দাদাকে বলতাম চোর লেবু নিয়েছে। দাদা বলত মানুষ শখ করে খেতে নিয়েছে, আমরা যা দেই তাতে হয় তো মানুষ চাহিদা মিটে না। কাউকে চোর বলা যাবে না। তখন আমরা বুঝতাম দাদা কতটা উদার। মানুষের এহেন আচরনে দাদা অনেকটা মানুষিক কস্ট পেলেন। পারিবারিকভাবে আলাপ করতেন মানুষ তো চাইলেই দেই আবার আড়ালেও নিতে হয়?
আমাদের মনে হলো লেবু গাছটিও বিষয়টি আচঁ করতে পেরেছিল। আস্তে আস্তে ফলন কমে যেতে থাকল। বাড়ীর অন্যান্য লেবু গাছগুলোও গোমরা হয়ে গেল।
দাদাও আমাদের ছেড়ে চলে গেল। বাড়ীর সব ফলজ গাছগুলো গোমরা হয়ে গেল। আস্তে আস্তে ফলন কমে আসলো।
মানুষ বলতে থাকলো যার ভাগ্য তার সাথেই চলে গেছে।
দাদার সেই লেবু গাছের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আমার বাবা, চাচা ও ফুফুরা এখনও বাড়িতে লেবুর বাগান করা অব্যাহত রেখেছে কিন্তু দাদার হাতে লাগানো লেবু গাছের মত অতটা ফলওয়ালা পাওয়া যাচ্ছে না।
এখনও আমাদের বাড়ীতে নানা রকম তরকারী ও ফলমুলের গাছ রয়েছে, তার মধ্যে পেপে, কাঁচা কলা, বিভিন্ন জাতের কাঁচা মরিচ শাক সবজি, চালতা, আম, কাঠাল নারিকেল ইত্যাদি।
দাদার নির্দেশনা অনুযায়ী ও দাদার সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আমার আব্বাও দাদার মত করে মানুষকে বিলিয়ে দিতে আনন্দ পায়। তা ছাড়াও আব্বা মই ও টোটকার ব্যবস্থা করে রেখেছে বাড়িতে, যাতে করে যে যার প্রয়োজন মত সহজেই নিতে পারে। এ বিষয়ে আমরা আব্বাকে কোন কিছু বললে সে আমাদেরকে বুঝায় দেয়ার মালিক আল্লাহ আর যার যার রিজিকই সে সে খায়। আমরা শুধু উছিলা।