রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে এক ধরনের নীরব দুর্ভোগে পড়ছেন বহু রোগী ও তাদের স্বজনরা। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের ভেতরে প্রয়োজনীয় অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে রোগীদের বাইরে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, দীর্ঘ হচ্ছে ভোগান্তি—আর প্রশ্ন উঠছে স্বাস্থ্যসেবার স্বচ্ছতা ও নৈতিকতা নিয়ে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বিদিপুর গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমানের অভিজ্ঞতা যেন এই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। অসুস্থ মাকে নিয়ে তিনি রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েকটি পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হয়। তবে বিস্ময়ের বিষয়, সেই পরীক্ষার একটি অংশ তাকে হাসপাতালের বাইরে একটি নির্দিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে করাতে বলা হয়। যুক্তি দেওয়া হয়—সেখানে নাকি কম খরচে দ্রুত রিপোর্ট পাওয়া যাবে।
মিজানুর রহমান বলেন, “সরকারি হাসপাতালে এসেছি খরচ কম হবে বলে। কিন্তু বাইরে পরীক্ষা করাতে গিয়ে খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে। কী করব, রোগীর জন্য তো সবই করতে হয়।”একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরিফ ইসলাম নামের আরেক রোগী। তিনি জানান, চিকিৎসক তার প্রেসক্রিপশনে একটি নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম লিখে দিয়েছেন এবং সেখানে পরীক্ষা করাতে বলেছেন। “ডাক্তার যেটা বলেছে, সেটাই তো মানতে হয়। তাই বাধ্য হয়েই বাইরে যাচ্ছি,”—বলছিলেন তিনি।
রহনপুর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা ফাতেমা খাতুনও একই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার জন্য আমাকে বাইরে যেতে বলা হয়েছে। হাসপাতালে এটা হয় না—এমনটাই বলা হয়েছে।”
শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়—রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী ও তাদের স্বজনদের মুখে একই অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, হাসপাতালে প্রায় সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্নভাবে রোগীদের বাইরে পাঠানো হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে সময় নষ্ট ও দৌড়ঝাঁপের কারণে রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী বিভাগসহ উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৫টি জেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালটির শয্যা সংখ্যা প্রায় ১২০০ হলেও প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন হাজারের বেশি রোগী এখানে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। ফলে চিকিৎসক ও জনবলের ওপর চাপ অনেক বেশি। এই চাপের কারণে অনেক সময় রোগীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এই বাস্তবতার আড়ালে অন্য কোনো অনিয়ম কাজ করছে কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। অনেকের অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র রোগীদের বিভ্রান্ত করে বাইরে পরীক্ষার জন্য প্রলুব্ধ করছে। কখনো সরাসরি, কখনো আবার পরোক্ষভাবে নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম বলে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের এ ধরনের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, সাধারণ মানুষ স্বল্প খরচে মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় সরকারি প্রতিষ্ঠানে আসেন। সেখানে যদি অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপানো হয়, তবে তা শুধু আর্থিক চাপই বাড়ায় না—স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থাও কমিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রোগীদের সচেতন করাও প্রয়োজন, যাতে তারা অপ্রয়োজনে বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ না করেন।
এ বিষয়ে রামেক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ডা. মনোয়ার তারিক বলেন, “প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম লেখা সম্পূর্ণ অনৈতিক। এটি চিকিৎসক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।” তিনি আরও বলেন, “হাসপাতালেই স্বল্পমূল্যে ও মানসম্মতভাবে প্রায় সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। রোগীদের বাইরে পাঠানো উচিত নয়, যদি না একান্তই প্রয়োজন হয়।”
অন্যদিকে রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, হাসপাতালের ভেতরেই প্রয়োজনীয় অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং খরচও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তিনি বলেন, “একটি চক্র রোগীদের ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে। বলা হচ্ছে হাসপাতালে এসব পরীক্ষা হয় না—যা সম্পূর্ণ অসত্য।”
তিনি আরও জানান, এমআরআই, সিটি স্ক্যান, এক্স-রে, ব্লাড কালচারসহ অধিকাংশ রুটিন পরীক্ষা হাসপাতালের ভেতরেই স্বল্পমূল্যে করা হচ্ছে। “রোগীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তারা সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন,”—যোগ করেন তিনি।