ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোছা. তাহসিনা রুশদীর লুনা। এই জয়ের মধ্য দিয়ে তিনি সিলেটের সংসদীয় রাজনীতিতে এক অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন। তিনি কেবল এই আসনেরই নন, বরং পুরো সিলেট বিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাছির আলীকে ৭৯ হাজার ২৫১ ভোটের এক বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়া লুনার এই বিজয়কে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীরা তাদের প্রিয় নেতা এম. ইলিয়াস আলীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, সিলেট-২ আসনে এবারের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮৩ জন। এর মধ্যে বিশ্বনাথ উপজেলায় ধানের শীষ প্রতীকে তাহসিনা রুশদীর লুনা পেয়েছেন ৬৭ হাজার ৯৭৭ ভোট, যেখানে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ১৭ হাজার ৯৫৪ ভোট। অন্যদিকে ওসমানীনগর উপজেলায় লুনা পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৭২০ ভোট এবং মুনতাছির আলী পেয়েছেন ১৯ হাজার ৪৯২ ভোট। এই দুই উপজেলা মিলিয়ে লুনার প্রাপ্ত মোট ভোটের সংখ্যা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা আমির উদ্দিন এবং গণফোরামের মুজিবুল হক অত্যন্ত সামান্য ভোট পেয়েছেন, যা নির্বাচনী লড়াইয়ে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
তাহসিনা রুশদীর লুনার এই বিজয় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সিলেট-২ আসনের এক সময়কার প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এম. ইলিয়াস আলীর স্ত্রী। ২০১২ সালে ইলিয়াস আলীর রহস্যময় নিখোঁজ হওয়ার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে লুনার রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় পেশাজীবী পরিচয় থেকে সরাসরি রাজপথে নামেন তিনি। গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতিতে এই অঞ্চলের নেতাকর্মীদের অভিভাবক এবং নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। ভোটারদের রায়ে তিনি আজ কেবল একজন জনপ্রতিনিধি নন, বরং তার নিখোঁজ স্বামীর উন্নয়ন ও রাজনীতির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবেও জনস্বীকৃতি পেলেন।
এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে লুনা তিনটি বিশেষ ইতিহাস গড়েছেন। প্রথমত, তিনি সিলেট বিভাগের ইতিহাসে প্রথম নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, সিলেট-২ আসনের নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো নারী সদস্য হিসেবে তিনিই প্রথম সংসদ ভবনে যাচ্ছেন। তৃতীয়ত, স্বামীর পর স্ত্রী হিসেবে একই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তিনি। বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর এলাকার ভোটাররা জানিয়েছেন, শান্তিপূর্ণ ও অবাধ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে তারা অত্যন্ত আনন্দিত। স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করছেন, স্বামীর রেখে যাওয়া উন্নয়নের ধারা লুনা পুনরায় শুরু করবেন এবং নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর সন্ধান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তার বিজয় বড় ভূমিকা রাখবে। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ শুক্রবার থেকেই এলাকা জুড়ে বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা গেছে।