বর্তমানে সাংবাদিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পেশা, যা সমাজের সচেতনতা এবং উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু কিছু অশুভ কর্মকাণ্ড এবং আত্মসাৎকারী পত্রিকার কারণে এই পেশার সম্মান হ্রাস পাচ্ছে। সাংবাদিক পরিচয়ের জন্য মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রেস কার্ড বিতরণকারী পত্রিকাগুলি প্রকৃত সংবাদকর্মীদের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে।
বিশেষ করে মফস্বলে এই সমস্যা আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। সেখানে অপরাধীরা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয়ে পরিচিতি তৈরি করছে। চোর-বাটপার, ছিনতাইকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীদের মতো অপরাধীরা সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের চোখে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকরা অনেকসময় সন্দেহের তীরের মুখোমুখি হচ্ছেন।
যখন আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার প্রেস কার্ডধারীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তখন মানুষের সঠিক সাংবাদিকতার প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হতে শুরু করে। সত্যিকার সাংবাদিকদের মাঝে মাঝে এই অপরাধীদের সঙ্গে তুলনা করে অপমানিত হতে হয়, যা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
এমন ঘটনা দেখা যায়, যেমন ফেসবুক পেইজ Boalkhali tv24 এর সাংবাদিক কামাল, যিনি একজন আচার বিক্রেতা। আবার c24 নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সাংবাদিকরা চট্টগ্রামের মার্জারটেক ট্রাফিক ইনস্পেক্টরের সাথে যুক্ত রয়েছেন বড় মাপের সাংবাদিক পরিচয়ে। অন্যদিকে, Eplus tv ব্যবসায়ীদের ভিডিও করে কিছু টাকা উপার্জন করার চেষ্টা করছে টিভিতে প্রচার করার নামে। এই সকল সাংবাদিকের কাছে রেজিস্ট্রেশন না থাকার পরেও সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার আসলেই একটি প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি করছে। যখন Eplus tv রেজিস্ট্রেশন আছে কিনা তা জানতে চাইলে তারা জানায় যে, বর্তমানে সরকার রেজিস্ট্রেশন দিচ্ছে না এবং তাদের অনলাইন টিভির রেজিস্ট্রেশন নেই, এটি সিএমপির কমিশনারও জানেন।
এই ধরনের আরো অনেক নাম সর্বত্র অনলাইন টিভি ও পত্রিকা আছে, যা নগরজুড়ে ছড়িয়ে আছে। অপর দিকে, বহদ্দারহাটের ইনস্পেকটর, মোহরার ইনস্পেকটর, কোতোয়ালি ইনস্পেকটর, পর্বতক মোড়ের ইনস্পেকটর এবং অক্সিজেন ইনস্পেকটর বলেছেন, এসব রেজিস্ট্রেশন বিহীন অনলাইন টিভি ও পত্রিকার কারণে তারা খুব অতিষ্ঠ। তাদের বিষয়ে আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের গত ৩০ জানুয়ারি একটি অধ্যাদেশ খসড়া করেছে, যেখানে লাইসেন্স ছাড়া সম্প্রচারের জন্য ৩ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। এই খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী টেরিস্ট্রিয়াল, স্যাটেলাইট, ক্যাবল টেলিভিশন এবং রেডিও, আইপি টিভি, ডিটিএইচ, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও, ওটিটি, স্ট্রিমিং এবং ভিডিও অন ডিমান্ড সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা অপেশাদার কনটেন্ট এই অধ্যাদেশের বাইরে থাকবে।
এছাড়া কিছু আইপি টিভির সাংবাদিকরা নিজেদের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, সিনিয়র প্রতিনিধি ও স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন এবং পুরো জেলা বা দেশের বিভিন্ন স্থানে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে শিক্ষাগত দক্ষতার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ধরনের আচরণ জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে, যা সুষ্ঠু সাংবাদিকতার পরিবেশকে ভেঙে ফেলছে।
সাংবাদিকদের মধ্যে নৈতিকতা, সততা ও পেশাদারিত্বের অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। সরকারের এবং সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর প্রয়োজন, টাকার বিনিময়ে প্রেস কার্ড বিতরণ বন্ধ করা এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
সত্যিকার সাংবাদিকতা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আমাদের উচিত, এই পেশার সুনাম ফিরিয়ে আনতে একসঙ্গে কাজ করা এবং সমাজের সঠিক তথ্য পরিবেশন করার জন্য সচেষ্ট হওয়া। সাংবাদিকতার এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে এবং নিজেদের পেশাগত নীতি ও দায়বদ্ধতা রক্ষা করতে হবে।