রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুট, জনস্বাস্থ্য ধ্বংস ও প্রশাসনিক দুর্নীতির এক ভয়ংকর চিত্র সামনে এলো বগুড়ার শিবগঞ্জে। সরকারি রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি বৃহৎ অবৈধ সিগারেট কারখানার সন্ধান পেয়েছে সেনাবাহিনী।
গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ২টা থেকে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকাল ৯টা পর্যন্ত টানা অভিযানে এই কালো কারখানার মুখোশ উন্মোচন হয়।
সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জানে আলম সাদিফ ও লেফটেন্যান্ট আল ফাহাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে শিবগঞ্জ উপজেলার খয়রাপুকুর এলাকায় শাহিনুর রহমানের মালিকানাধীন একটি নামহীন কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ব্যান্ডরোল, ভুয়া মোড়ক ও শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি জব্দ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে কাঠের গুঁড়া মিশ্রিত বিষাক্ত তামাক ব্যবহার করে অনুমোদনহীন ১৪টি ব্র্যান্ডের মোড়কে নকল সিগারেট তৈরি করে বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল।
অভিযানে উদ্ধার করা হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকার নকল ব্যান্ডরোল, ১০ লাখ টাকার জাল মোড়ক, ১০ মণ ভেজাল তামাক এবং আনুমানিক ১০ কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক সিগারেট উৎপাদন যন্ত্রপাতি। এসব জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো—কারখানার রেজিস্ট্রার ও স্টক খাতায় বগুড়া কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অফিসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মোর্শেদা আলমের স্বাক্ষর পাওয়া গেছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজ হাতে অবৈধ কারখানাকে বৈধতার সিল দিয়েছেন—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠে এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত যাতায়াত ও প্রকাশ্য সমর্থনের কারণেই বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ কারখানা নির্বিঘ্নে চলেছে। কেউ মুখ খুললে ভয়ভীতি ও প্রভাব খাটানো হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। অবৈধ এই প্রতিষ্ঠান কীভাবে কার্যত বৈধতা পেল—সে বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা লিটন কুমার সেন রহস্যজনকভাবে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তার নীরবতাও দুর্নীতির সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে।
অভিযানের সময় কারখানার মালিক শাহিনুর রহমান কৌশলে পালিয়ে গেলেও পাঁচজন শ্রমিককে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জিয়াউর রহমান আটক শ্রমিকদের মোট ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন এবং অবৈধ কারখানাটি সিলগালা করার নির্দেশ দেন।
ইউএনও জিয়াউর রহমান বলেন, “এটি শুধু রাজস্ব ফাঁকি নয়, সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ওপর নৃশংস হামলা। জব্দকৃত সব মালামাল আগামী বৃহস্পতিবার ধ্বংস ও বাজেয়াপ্ত করা হবে।” সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনের চোখের সামনে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে এ ধরনের বহুজাতিক জালিয়াতি কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এর পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট ও প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—যাদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ বন্ধ হবে না।