৬ জানুয়ারি ২০২৬ দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে স্বচ্ছতা জোরদার, ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং একটি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি) একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা হোটেলে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল এনইআইআর-এর হাত ধরে শুরু হোক নিরাপদ বাংলাদেশ।
সংবাদ সম্মেলনে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব, ভোক্তা সুবিধা এবং দেশের মোবাইল ফোন ইকোসিস্টেমে এর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয় এবং এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে এমআইওবি’র সদস্যবৃন্দসহ শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এমআইওবি জানায়, সরকার ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বৈধ আমদানিকে উৎসাহিত করতে এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্মার্টফোন আমদানি শুল্ক হ্রাসের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। সংগঠনটির মতে, এসব নীতিগত উদ্যোগ দীর্ঘদিনের অনিয়ম কমাতে এবং একটি সুশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আলোচনায় বলা হয়, এনইআইআর কার্যকর হলে অবৈধ, নকল ও চুরি হওয়া মোবাইল ফোন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে, যা সরাসরি ভোক্তা নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে অবৈধ আইএমইআই ব্যবহার বন্ধ হওয়ায় ফোন ক্লোনিং, প্রতারণা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
আলোচকরা আরও বলেন, এ উদ্যোগ বাজারে বৈধ ব্যবসা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।
এমআইওবি’র তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৮টি স্মার্টফোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠানে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। এই খাতে সরাসরি প্রায় ৫০ হাজার দক্ষ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। পাশাপাশি ডিলার, ডিএসআর, সার্ভিস ও খুচরা বিক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে আরও প্রায় ৫০ হাজার মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩০ শতাংশ নারী শ্রমিক সক্রিয়ভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে এ শিল্প থেকে সরকার প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর, মজুরি ও ইউটিলিটি বিল অর্জন করছে।
তবে এমআইওবি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানায়, এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি কিছু অবৈধ স্মার্টফোন ব্যবসায়ীর সহিংস ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংগঠনটির দাবি, দেশের প্রায় ১২ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীর মধ্যে মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার ব্যবসায়ী সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে, যদিও স্মার্টফোন আমদানি শুল্ক হ্রাসের দাবি ইতোমধ্যে মেনে নেওয়া হয়েছে।
এমআইওবি জানায়, এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে বহিরাগতদের এনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, বিটিআরসি কার্যালয়ে ভাঙচুর, শিশুদের ব্যবহার করে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈধ মোবাইল ফোনের দোকান জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে বৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
সংগঠনটির মতে, আইনবহির্ভূত এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করছে না, বরং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর নির্ভরশীল স্মার্টফোন শিল্পে এ ধরনের অস্থিরতা ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে এমআইওবি সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, এনইআইআর বাস্তবায়ন দেশের মোবাইল ফোন শিল্পে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও ভোক্তা সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে অবৈধ ও নকল মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং বাজারে বৈধ ব্যবসা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে। আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই। একই সঙ্গে এনইআইআর বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে বিটিআরসি কার্যালয়ে সংঘটিত ভাঙচুরসহ যেকোনো সহিংস ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই।
তিনি আরও বলেন, নীতিগত ধারাবাহিকতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় থাকলে স্মার্টফোন শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলে এমআইওবি আশাবাদী।
বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআইওবি) মোবাইল ফোন শিল্পের সকল স্টেকহোল্ডারের স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্ব করে এবং একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও প্রবৃদ্ধিমুখী টেলিকম ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে।