মাঠজুড়ে আমন ধানের সোনালি ফসল। এ বছরে আমন ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং বাজার দর না থাকার ফলে লোকসানের শঙ্কা দেখছে প্রান্তিক কৃষকেরা। উৎপাদন ব্যায় বাড়লেও ধানের বাজারমূল্য চলছে গত বছরের নিয়মে।
দীঘিনালা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর উপজেলায় ৪৭৯০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২৬ হাজার পাঁচশ মেট্রিক টন।
সরেজমিনে দেখা যায়, গত বছর পর পর ৪ বার বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে আমনে। এ বছর আবহাওয়া অনুকূল পরিবেশে থাকায় আমন ধানের উৎপাদনে এসেছে কৃষকের মুখে হাসি। তবে সেই হাসি যেন বিষাদে পরিনত হচ্ছে। ধানের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও লাভের মুখ দেখছেন না বাজার দর না থাকার ফলে।
প্রান্তিক একাধিক কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি কানি (১কানি=৪০শতাংশ) জমিতে দেশীয় বিভিন্ন জাতের ধান উৎপাদন হয়েছে ১৮ থেকে ২০ মণ। এছাড়াও হাইব্রিড জাতের ফলনও তুলনামূলকভাবে বেড়েছে। বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এক কানি জমিতে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায়। ফলে খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে চাষিদের।
স্থানীয় কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমি ১ হেক্টর (১ হে. = ৬কানি) জমিতে ধান চাষ করেছি। ধানের ফলন গত বছরের তুলনায় এবছর বেশি হয়েছে, অন্তত ১১০-১২০ মন আমন ধান পেয়েছি। বাজার দর না থাকায় ৯৩০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষক ধান উৎপাদনে অনুৎসাহী হয়ে উঠবে। প্রশাসনের বাজার দর নিযন্ত্রণ করা জরুরি।
আরেক কৃষক মো. রাজ্জাক বলেন, “ধার দেনা করে চার কানি জমিতে এবার ধান করেছি। ধান বিক্রি করে হাতে একটাও টাকা রাখতে পারিনি। সব চলে গেছে ধার পরিশোধে।
একাধিক কৃষকের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নিত্য পণ্যের দাম বাড়লেও ধানের দাম বাড়েনি। সরকারের সঠিক নজরদারি না থাকায় তারা প্রকৃত ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি ভাবেও আমাদের ধান কিনছে না। আমরা লোকসানে পড়ে যাচ্ছি।
স্থানীয়দের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা গেলে কৃষকদের মধ্যে ধান চাষে অনীহা দেখা দিতে পারে। যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি বিপণন বিভাগের সিনিয়র কর্মকর্তা তুষার কান্তি চাকমা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই চাষীরা লোকসানের মুখে ধান বিক্রি করছে। চাষী ও ব্যবসায়ীরা কত দামে কেনাবেচা করবে, এটি তাদের বিষয়। তবে খাদ্য বিভাগ যখন ধান ক্রয় করবে, তখন যথাযথ মূল্যই দেওয়া হবে।”
দীঘিনালা কৃষি সম্প্রসারণের ভারপ্রাপ্ত কৃষি সহ-কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমন বলেন, “এরই মধ্যে দুই হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে প্রায় ৫ টন করে ফলন হয়েছে। ফলন ভালো হলেও দাম না পাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষীরা। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টি তুলে ধরবো।”
দীঘিনালা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিমো চাকমা বলেন, “গত বছর সরকারি ভাবে আমন ধান সংগ্রহ বরাদ্দ পেয়েছিলাম ৯০ মেট্রিক টন, এ বছর এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। গত বছর সরকারি ভাবে ১৩৬০ টাকা ধরে ধান সংগ্রহ করেছি।”
স্থানীয় কৃষকদের দাবী সরকারি ধান সংগ্রহ চাহিদা বরাদ্দ বাড়ালে কৃষক ধান উৎপাদন উৎসাহী হয়ে উঠবে।