খুলনার ডুমুরিয়ায় অপব্যবহায়িত সম্পদে পরিনত হয়েছে সরকারের আশ্রয়ন প্রকল্প। একদিকে পানি অন্যদিকে ভাঙাচোরা ঘর। নির্মানের তিন বছরের মধ্যে ধসে গেছে ফ্লোর। টোকা দিলে ভেঙে পড়ছে প্লাস্টার,ফেটেগেছে ঘরের পিলার ও টয়লেটের দেয়াল। সরকারি কর্মকর্তাদের চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনে ঘর পেয়েও গৃহহীন রয়েছেন প্রকল্পের অধিকাংশ সুফলভোগীরা। জানাযায়, ২০২১-২২ও ২০২৩ অর্থ বছরে চার ধাপে ডুমুরিয়া উপজেলায় গৃহহীন এবং বাস্তচ্যুত ১ হাজার ১০০ শত ৫৫ হাজার পরিবারের মাঝে জমি সহ ঘর হস্তান্তর করে আওয়ামীলীগ সরকার। ঘরগুলো নির্মানে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২১ কোটি ৮৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা। প্রতিঘরের অনুকুলে দেওয়া হয়েছে ২ শতাংশ জমি। সব মিলে উপজেলায় মোট ২৩.১ একর সম্পত্তির উপর ঘর গুলো নির্মান করা হয়। এসব ঘর নির্মান থেকে শুরু করে দলিল হস্তান্তর পর্যন্ত ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সরকারের কাছ থেকে পুরস্কৃত হওয়ার আশায় তখন ডুমুরিয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘর নির্মান শেষ করার পরিকল্পনা নেয় উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার ছিলেন প্রকল্পের একক তত্ত্বাবধায়ক। ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের সাজিয়াড়া শেয়ারঘাটা আবাসন প্রকল্পের ঘর নির্মানের তিন বছর পার না হতেই ধসে গেছে ফ্লোর। একটি ঘরের দেয়ালের সাথে অন্য ঘরের দেয়াল সংযুক্ত করা হয়েছে। যা সিডিউলে উল্লেখ রয়েছে প্রতিটি ঘরের দুরত্ব কমপক্ষে ৬ ফুট থাকতে হবে। অনিয়মের এখানেই শেষ নয়। ঘরের নষ্ট হয়ে গেছে দরজা জানালা। টিনের জোড়া দিয়ে ঘরের ভিতর পড়ে বৃষ্টির পানি। ১৮ নম্বর ঘরের বাসিন্দা শাহানারা খাতুন জানান, ” ঘর নির্মানের প্রথম বছরেই ফ্রোর ধসে যায়। কিছুদিন পর দেয়াল ফাটল দেখা দেয়। এখন আর ঘরে বসবাস করার উপায় নেই। একদিকে ভাঙা ঘর, অন্যদিকে কোমর পানিতে ডুবে রয়েছে ৫ মাস যাবৎ। ১১ নম্বর ঘরের বাসিন্দা তুজাম্মেল মোল্লা জানান, ঘর ভেঙে চুড়ে পড়েছে। তাছাড়া ঘরগুলো উচ্চতা অনেক কম করেছে। যার কারনে বৃষ্টির মৌসুম থেকে শুরু করে শীতের অর্ধেক পর্যন্ত আমাদের পানির সাথে বসবাস করতে হয়। ২০ নম্বর ঘরের বাসিন্দা পারভীন বেগম বলেন, ” ঘরের যা অবস্থা টোকা দিলে প্লাস্টার খসে পড়ছে। একটা টিউবওয়েল আছে কিন্তু সেটি দিয়ে ঘোলা পানি ওঠে। বাহিরে থেকে আমাদের খাবার পানি আনতে হয়। আমরা ত্রান চাচ্ছিনা, সরকার আমাদের ঘরগুলো অন্তত উচু করে দিক। বর্তমানে এ আবাসন ঘর ছেড়ে ৩০ টি পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক স্বচ্ছল ব্যক্তির নামেও ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঔই সময় আওয়ামীলীগ নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও স্বজন প্রীতির কারনে প্রকৃত গৃহহীন পরিবার আড়ালে পড়ে যায়। যার কারনে অনেকে ঘর দখলে রেখে অন্যত্র বসবাস করছে। ভুমি অফিস সুত্রে জানা্যায়, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় ৪ টি ধাপে উপজেলার ধামালিয়া ইউনিয়নে ৩৮ টি, রঘুনাথপুরে ৭ টি, রদাঘরায় ১০৮ টি, খর্নিয়ায় ৩২ টি,আটলিয়ায় ৩১২ টি, শোভনায় ৩২৫ টি, সাহসে ৫ টি, ভান্ডারপাড়ায় ১৫৭ টি, ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নে ৮৯ টি এবং রংপুর ইউনিয়নে ৮২ টি ঘর নির্মান করা হয়। মোট ১ হাজার ১শত ৫৫ ঘরের মধ্যে ৮৮০ টি ঘরের দলিল হস্তান্তর করা হয়। এসব ঘরের মধ্যে অধিকাংশ ঘর ভেঙে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অতি নিন্মমানের নির্মান সামগ্রী দিয়ে এসব ঘর করার অভিযোগ সচেতন এলাকাবাসীর। আটলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান শেখ হেলাল উদ্দিন জানান, ” ঘর ভেঙে পড়া সহ বিভিন্ন আসবাবপত্র নষ্ট হবার খবর একের পর এক শুনতে হচ্ছে। তখন ঘরগুলো সম্পুর্ন ইউএনওর তত্ত্বাবধানে নির্মান হয়েছে। সেখানে কোন ইউপি চেয়ারম্যান বা মেম্বারদেরকে সম্পৃক্ত করেনি। অতি নিন্ম মানের নির্মান সামগ্রী ব্যবহার করায় নির্মানের ২/৩ বছর পার পার না হতেই ভেঙে পড়ছে। তিনি বলেন, চুকনগর ও কাঠালতলা এলাকায় ভদ্রানদীর চর ভরাটির জায়গায় আবাসন করা হয়েছে। সম্প্রতি নদী খননের সীমানায় অধিকাংশ ঘর পড়ে গেছে। ফলে এসব ঘর উচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে যেমন টেকসই ভাবে ঘর নির্মান না হওয়া অন্যদিক নদী খননের ফলে উচ্ছেদ আতংকে রয়েছে শতাধিক গৃহ। ফলে অপব্যয়িত সম্পদে পরিনত হয়েছে সরকারের এই আশ্রয়ন প্রকল্প। এবিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক মো: তৌফিকুর রহমান বলেন, ” ডুমুরিয়ায় আবাসন প্রকল্পের বিষয় আমার নলেজে নেই। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখবো ঘর নির্মানে কোন অনিয়ম বা দুর্নীতি রয়েছে কিনা। অনিয়মের সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।