দেশে যখন কোনো বেওয়ারিশ বা অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়, তখন মানবিক ও আইনি দায়িত্ব হিসেবে পুলিশের উদ্যোগে সেই লাশের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এই দাফন কার্য সম্পন্ন করতে একজন তদন্ত কর্মকর্তা (এসআই বা ইনচার্জ অফিসার)কে ব্যক্তিগতভাবে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি কোষাগার থেকে এই খাতে কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মানবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
পুলিশ সদস্যদের বক্তব্য, ঢাকার আশেপাশের তিনটি থানার এসআইরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন,
“প্রতিটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের ক্ষেত্রে লাশ বহন, গোসল, কাফন, জানাজা, কবর খোঁড়ার খরচসহ বিভিন্ন খাতে গড়ে ৫-৬ হাজার টাকা লাগে। কিন্তু সরকারিভাবে আমরা এই খরচ পাই না। আমাদের নিজের পকেট থেকেই টাকা দিয়ে দাফন করতে হয়। অনেক সময় সহকর্মীদের মধ্যেও চাঁদা করে টাকা জোগাড় করতে হয়।”
তথ্যসূত্র অনুযায়ী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ২০২৩ সালের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। এর বেশিরভাগই ঘটে সড়ক দুর্ঘটনা, নদীতে ডুবে মৃত্যু ও অজ্ঞাত অসুস্থতায় মৃত্যুর ঘটনায়।
আইন বিশেষজ্ঞের মতামত, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন রিপন বলেন,
“বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী বেওয়ারিশ লাশ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পুলিশ শুধু আইনি প্রক্রিয়া তদারক করবে, কিন্তু আর্থিকভাবে তাদের ওপর বোঝা চাপানো সংবিধানের মূলনীতির পরিপন্থী। সরকারের আলাদা তহবিল থাকা জরুরি।”
সামাজিক গবেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মন্তব্য, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্হা ‘আইন সহায়তা তথ্য রিপোর্টার মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ’ এর সহ- সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, “পুলিশ বাহিনী শুধু আইন প্রয়োগকারী নয়, অনেক সময় তারাই মানবিক সেবার শেষ অবলম্বন হয়ে দাঁড়ান। তাই তাদের জন্য ‘হিউম্যানিটারিয়ান ফান্ড’ চালু করা এখন সময়ের দাবি।”
জনমতের দাবি,সাধারণ মানুষ মনে করেন, এই খরচ পুলিশের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব। করদাতাদের টাকায় পরিচালিত বাজেট থেকে বেওয়ারিশ লাশ দাফন-কাফনের জন্য জরুরি তহবিল গঠন করা উচিত, যা দেশের মানসিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পুলিশের মানবিক সেবাকে সম্মান জানাতে হলে এবং আইনি দায়িত্বকে আরও কার্যকর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে ‘বেওয়ারিশ লাশ দাফন তহবিল’ গঠন ও নীতিমালা প্রণয়নের দাবি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে। রাষ্ট্র যদি এই দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে এটি হবে মানবিকতার প্রতি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।