লালমনিরহাটে একটি সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে অনিয়ম, অবৈধ ঋণ কার্যক্রম ও গ্রাহকদের অর্থ নিয়ে ওঠা অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের পর দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। রংপুর সাইবার ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে মামলার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), লালমনিরহাট।সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘটনায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লালমনিরহাটে কর্মরত সাংবাদিকরা। তাদের দাবি, তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের আইনি প্রক্রিয়ায় হয়রানি করা হচ্ছে।
জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় ‘গ্রাহকের ১২ কোটি টাকা নিয়ে উধাও দুই সমিতি’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ‘তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি’ ও ‘তিস্তা ইন্টারন্যাশনাল’-এর স্বত্বাধিকারী এম. এ. হাশেম ওরফে বাবুলের বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের অর্থ আটকে রাখা, উচ্চ সুদে টাকা লেনদেন এবং সঞ্চয়ের অর্থের বিপরীতে নিম্নমানের পণ্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
এ ছাড়া একই বিষয় ও অভিযোগ নিয়ে দেশের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয় বলে জানা গেছে।সংবাদ প্রকাশের পর ‘তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সভাপতি এবং বর্তমানে ‘তিস্তা সমবায় বাজার’ নামে পরিচিত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. হাশেম রংপুর সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।মামলায় দৈনিক কালবেলা পত্রিকার লালমনিরহাট প্রতিনিধি শেখ খায়রুজ্জামান শাহেদ (এস. কে. সাহেদ) এবং নয়া দিগন্ত (ডিজিটাল)-এর প্রতিনিধি মো. জুবাইর আহমেদ খানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ আনা হয়।
ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি আমলে নিয়ে বিষয়টি তদন্তের জন্য সিআইডি লালমনিরহাটকে দায়িত্ব দিয়েছেন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।মামলার বিষয়ে দৈনিক কালবেলা-এর লালমনিরহাট প্রতিনিধি শেখ খায়রুজ্জামান শাহেদ বলেন, “আমরা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবাদ প্রকাশ করিনি। সমবায় সমিতির কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের যেসব অভিযোগ ও অনিশ্চয়তা ছিল, সরেজমিনে সেই বিষয়গুলোই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে আমাদের কণ্ঠরোধ এবং অভিযোগগুলোর মূল বিষয় আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।”
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেসক্লাব লালমনিরহাটের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন স্বপন বলেন, “কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি থাকলে তার জবাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের পর সরাসরি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগজনক। আমরা এই মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং হয়রানি বন্ধের দাবি করছি।”
সাংবাদিক নেতা শরিফুল ইসলাম রতন বলেন, “অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এটি প্রতিশোধমূলক কি না, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। আমরা বিশ্বাস করি, সিআইডির নিরপেক্ষ তদন্তে প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে। সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধ না হলে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
মামলার বিষয়ে বক্তব্য জানতে এম. এ. হাশেম ওরফে বাবুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।অন্যদিকে, মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি সিআইডি লালমনিরহাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, সমবায় কার্যক্রম নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে সংবাদ প্রকাশকারী সাংবাদিকদের আইনি জটিলতায় জড়ানো হচ্ছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।