মায়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে অপহৃত হওয়ার দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হলেও কক্সবাজারের উখিয়ার সীমান্তঘেঁষা পালংখালী ইউনিয়নের চার জেলের কোনো হদিস মেলেনি। জীবন-জীবিকার তাগিদে নাফ নদীর উপশাখা মেদাই খালে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া এসব জেলে জীবিত না মৃত—তা নিয়ে কাটেনি ধোঁয়াশা। একদিকে স্বজনদের অন্তহীন অপেক্ষা ও কান্না, অন্যদিকে সীমান্তজুড়ে চরম নিরাপত্তা শঙ্কা—সব মিলিয়ে পুরো নাফ নদ তীরবর্তী জনপদে এখন শোক ও আতঙ্কের ছায়া।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর জীবন-জীবিকার তাগিদে পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমান পাড়া সীমান্তসংলগ্ন মেদাই খালে মাছ ধরতে যান পাঁচ জেলে। এ সময় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের আটক করে নিয়ে যায়।
অপহৃত পাঁচ জেলের মধ্যে একজন ছৈয়দুল বশরের গুলিবিদ্ধ মরদেহ আটকের দুই দিন পর নাফ নদীর উপশাখা মেদাই খাল থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে উখিয়া থানা পুলিশ মরদেহটি তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। তবে বাকি চার জেলের বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পালংখালী ইউনিয়নের আনজুমান পাড়া ও পূর্ব ফারিরিবিল সীমান্ত এলাকা থেকে পাঁচ জেলে মাছ ধরতে গিয়ে অপহৃত হন। অপহরণের দুই দিন পর ছৈয়দুল বশর নামে এক জেলের গুলিবিদ্ধ মরদেহ মেদাই খালে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তবে অপর চার জেলে—সাইফুল ইসলাম, লুৎফর রহমান, মো. ইউসুফ এবং ইউসুফ জালালের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তার কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনও মেলেনি।
অপহৃত জেলেদের পরিবারগুলোতে এখন শুধুই নীরব হাহাকার। অপহৃত সাইফুলের বাবা জিয়াবুল হক ও ইউসুফের বাবা মনজুর আলম ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করে জানান, “একজনের লাশ পাওয়ার পর থেকে আমরা চরম আতঙ্কে আছি। তারা বেঁচে আছে নাকি তাদেরও হত্যা করা হয়েছে—সেটুকু তথ্যও কেউ দিতে পারছে না। প্রশাসনের দরজায় ঘুরেও কোনো সদুত্তর মেলেনি।”
নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের সদস্যরা আরো জানান, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের প্রিয়জনদের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় প্রতিদিনই নতুন করে উৎকণ্ঠা তৈরি হচ্ছে। তারা এখনো বিশ্বাস করেন, তাদের স্বজনরা জীবিত থাকলে একদিন ফিরে আসবেন। সেই আশায় পথ চেয়ে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। সীমান্তে মাছ ধরা ও জীবিকার কাজে যাতায়াতকারী জেলেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান স্থানীয়রা।
এবিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী সীমান্ত পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরে জানান, রাখাইন রাজ্য বর্তমানে মায়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রথাগত ‘পতাকা বৈঠক’ আয়োজনের সুযোগ নেই। ফলে অপহৃতদের ফেরত আনার প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে আইনি ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতায়। পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক, ৬৪ বিজিবি ও টেকনাফ ২ বিজিবির দপ্তরে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, নিখোঁজদের জিডির কপি বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে প্রশাসনিক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও প্রকৃত পরিস্থিতি এখনও অস্পষ্ট।
এদিকে ফেরার অপেক্ষায় স্বজনরা, নিখোঁজ চার জেলের পরিবার এখন একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—তাদের সন্তানরা কোথায়, কী অবস্থায় আছেন এবং আদৌ কি ফিরবেন ঘরে? এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে নিখোঁজ জেলেদের সন্ধান ও দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।