বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েক দিনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সম্ভাব্য পদত্যাগের গুঞ্জন। দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে; পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা এবং বিভিন্ন পক্ষের যোগাযোগের কথাও সংবাদে উঠে এসেছে। তবে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির কার্যালয় কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। ফলে বিষয়টি এখনও গুঞ্জন ও সংবাদভিত্তিক আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সংযম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো সাংবিধানিক পদ নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু সরকারি ঘোষণা আসার আগে কোনো সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, এমন গুঞ্জন জনমনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন তৈরি করে- যদি রাষ্ট্রপতি সত্যিই পদত্যাগ করেন, তাহলে এরপর কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনীতির চেয়ে বেশি রয়েছে সংবিধানে।
রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান। যদিও সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার হাতে ন্যস্ত, তবুও রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক বৈধতার প্রতীক। তাই রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে যেকোনো পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিগত নয়; সেটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবিধান এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ পাঁচ বছর; অর্থাৎ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। ফলে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় দুই বছর আগে পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়াটা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের সংবিধান অবশ্য এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে তাঁর পদ ত্যাগ করতে পারবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের জন্য কারও অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। পদত্যাগপত্র যথাযথভাবে স্পিকারের কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর হয়। এখানে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের কোনো সাংবিধানিক বিধান নেই।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেকেই মনে করেন রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের জন্য সরকারের সম্মতি বা সংসদের ভোট প্রয়োজন হতে পারে। বাস্তবে তা নয়। সংবিধান রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং একটি সরল ও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে।
এরপর আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন- রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো সংকট তৈরি হবে কি?
এর উত্তরও সংবিধানই দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর সংবিধানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে শূন্যতা সৃষ্টি হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা থেমে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এখানেই একটি পরিণত সংবিধানের শক্তি নিহিত। ব্যক্তি পরিবর্তিত হতে পারেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে।
তবে আইন যতটা স্পষ্ট, রাজনীতি ততটাই জটিল।
রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন এবং সাংবিধানিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া থেকে শুরু করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
অন্যদিকে, তাঁর দায়িত্বকাল বিতর্কমুক্তও ছিল না। বিভিন্ন সময়ে তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠেছে, রাজনৈতিক সমালোচনা হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি পদকে কেন্দ্র করে নানা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে অপমানিত বোধ করার কথাও বলেছিলেন। এসব ঘটনা দেখায়, রাষ্ট্রপতির মতো একটি সাংবিধানিক পদও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে নয়।
তবে এখানেই আমাদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতির পদকে যদি দলীয় রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত করা হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি সরাসরি সরকার পরিচালনা না করলেও তিনি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক মর্যাদার প্রতীক। তাই তাঁর পদকে ঘিরে যে কোনো সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
গণতন্ত্রে সরকার পরিবর্তন হতে পারে, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলাতে পারে, রাষ্ট্রপতিও পরিবর্তিত হতে পারেন। কিন্তু এই পরিবর্তনের প্রতিটি ধাপ যদি সংবিধান মেনে সম্পন্ন হয়, তবেই রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। অন্যথায় অনিশ্চয়তা, বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল কিংবা অন্য যে-ই হোক, রাষ্ট্রপতি পদকে কেন্দ্র করে অপ্রমাণিত তথ্য বা চাপের রাজনীতি নয়; বরং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই গণতান্ত্রিক চর্চার পরিচায়ক। কারণ রাষ্ট্রপতি কোনো দলের নয়; তিনি রাষ্ট্রের।
গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতির সম্ভাব্য পদত্যাগের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবশ্যই প্রকাশিত হতে পারে। কিন্তু সেই সঙ্গে নিশ্চিত তথ্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং প্রেক্ষাপট সমান গুরুত্বে তুলে ধরা প্রয়োজন। সংবাদ ও গুঞ্জনের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে না দেওয়াও নাগরিক দায়িত্বের অংশ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের কৌতূহল স্বাভাবিক। কিন্তু কৌতূহলের চেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা। রাষ্ট্রপতি যদি ব্যক্তিগত বা স্বাস্থ্যগত কারণে দায়িত্ব ছাড়তে চান, সেটি তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। আবার তিনি যদি দায়িত্বে বহাল থাকেন, তাও সংবিধানের আলোকে বৈধ। কোনো ক্ষেত্রেই অনুমান বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
এই আলোচনায় আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। একটি পরিণত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের শক্তি কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান, আইন এবং সাংবিধানিক সংস্কৃতির ওপর। ব্যক্তি আসবেন, দায়িত্ব পালন করবেন, বিদায় নেবেন। কিন্তু রাষ্ট্র, সংবিধান এবং প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে। সেই বিশ্বাসই গণতন্ত্রের ভিত্তি।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন তাই কেবল একজন ব্যক্তিকে নিয়ে আলোচনা নয়; এটি আমাদের সাংবিধানিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। যদি পদত্যাগ হয়, তাহলে সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আর যদি না হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতি তাঁর নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করবেন। উভয় ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সংবিধানের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তি ও দলকে কেন্দ্র করে বিতর্কের অভাব নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সংবিধানই হওয়া উচিত সর্বোচ্চ পথপ্রদর্শক। রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বর্তমান আলোচনাও আমাদের সেই মৌলিক সত্যটি আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
অতএব, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন নিয়ে রাজনৈতিক কৌতূহল থাকতেই পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো- যে সিদ্ধান্তই আসুক না কেন, তা যেন সংবিধানের বিধান, রাষ্ট্রীয় শালীনতা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতির আলোকে বাস্তবায়িত হয়। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি ব্যক্তি নয়; তার প্রতিষ্ঠান। আর সেই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় ভিত্তি হলো সংবিধানের প্রতি সবার নিঃশর্ত আস্থা।