টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের বৈলারপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম মানবসেবার এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন। পেশায় কৃষক হলেও গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে গ্রামের মৃত ব্যক্তিদের কবর খনন করে আসছেন। এ পর্যন্ত তিনি দুই শতাধিক মানুষের কবর নিজ হাতে খনন করেছেন।
অত্যন্ত সহজ-সরল ও সাদাসিধে জীবনযাপনকারী আবুল কাশেম একসময় মুদি ব্যবসা করতেন। বর্তমানে কৃষিকাজের পাশাপাশি সংসার পরিচালনা করেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী, চার ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই কবর খননের কাজে যুক্ত তিনি। গ্রামের কিংবা আত্মীয়-স্বজনের কারও মৃত্যুর খবর পেলেই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সহযোগীদের নিয়ে কবর খননের কাজ সম্পন্ন করেন। জীবনের কোনো সময়ই এ কাজের বিনিময়ে তিনি কারও কাছ থেকে অর্থ বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি।
আবুল কাশেমের মতে, মানুষের শেষ ঠিকানা প্রস্তুত করে দেওয়ার মতো মানবিক কাজে যে আত্মতৃপ্তি ও মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়, তা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনীয় নয়। কৃষিকাজের স্বল্প আয়েই তিনি সততার সঙ্গে সংসার পরিচালনা করছেন এবং মানবসেবাকে জীবনের অন্যতম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
কবর খননের কাজে সাধারণত পরিমাপক ফিতা, শাবল, কোদাল, খন্তা এবং বড় নিরানি ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ কাজে যুক্ত থাকায় তিনি এলাকার অনেকের কাছে একজন দক্ষ খন্দক (কবর খননকারী) হিসেবে পরিচিত।
শুধু নিজেই নয়, তিনি স্থানীয় মোহাম্মদ মর্তুজ আলী, দুলাল হোসেন ও সরজ আলীকেও কবর খননের কাজ শিখিয়েছেন। বর্তমানে তাঁরাও নিজ নিজ এলাকায় কেউ মারা গেলে বিনা পারিশ্রমিকে কবর খনন করেন। ফলে মৃত ব্যক্তির দাফন-কাফনের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
আবুল কাশেমের বাড়ি সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের বৈলারপুর গ্রামে। প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি নিরলসভাবে এ মানবিক সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। গ্রামাঞ্চলে কবর খননকারীদের সাধারণত ‘খন্দক’ নামে ডাকা হয়। একজন কৃষকের পাশাপাশি আবুল কাশেম একজন নিবেদিতপ্রাণ খন্দক হিসেবেও এলাকায় সুপরিচিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মর্তুজ আলী বলেন,“কাশেম চাচা অত্যন্ত সহজ-সরল, বিনয়ী ও হাসিখুশি মানুষ। তাঁকে কখনো রাগ করতে বা মন খারাপ করতে দেখিনি। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, গ্রামের কেউ মারা গেলে তিনি সবার আগে কবর খননের কাজে ছুটে যান। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবসেবা তাঁকে সবার কাছে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছে।”
আবুল কাশেম বলেন,“ছোটবেলা থেকেই মৃত মানুষের কবর খনন করতে ভালো লাগে। এটা আমার কাছে একটি মানবিক দায়িত্ব। মানুষের জন্য সামান্য কিছু করতে পারলেও মনে অনেক শান্তি পাই। কৃষিকাজ করে সংসার চালাই, পাশাপাশি গ্রামের কেউ মারা গেলে বিনা পারিশ্রমিকে কবর খনন করে দিই। যতদিন বেঁচে থাকব, মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন খান গুর্খা বলেন,
“আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই দেখে আসছি, খন্দকেরা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই মৃত মানুষের কবর খনন করে থাকেন। এটি অত্যন্ত মহৎ ও মানবিক কাজ। নিঃস্বার্থ মানুষরাই এমন সেবা করতে পারেন।”
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন,“গ্রামে যারা কবর খননের কাজ করেন, আমরা তাঁদের খন্দক বলেই চিনি। তাঁরা সাধারণত কোনো পারিশ্রমিক নেন না। বহু বছর ধরে কাশেম চাচাকে এ কাজ করতে দেখছি। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবসেবা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”
মানবসেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করা আবুল কাশেম প্রমাণ করেছেন—অর্থ নয়, আন্তরিকতা ও মানবিকতাই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।