মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার ধামশ্বর ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ৩৪ বস্তা সরকারি চাল আটকের পর তা পুনরায় অসাধু চক্রের হাতে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ধামশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে। চাল আটকের নাটকীয়তা ও পরবর্তীতে তা ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ধামশ্বর এলাকার দুই ভ্যানে ৩৪ বস্তা সরকারি চাল সন্দেহজনক মনে করে গতিরোধ করেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। জিজ্ঞাসাবাদে ভ্যানচালকরা জানান, ধামশ্বর বাজারের নার্গিস নামের এক ডিলারের দোকান থেকে চালগুলো ঘিওর উপজেলা খাদ্য গুদামে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় সাইদুর নামের এক ব্যবসায়ী উপস্থিত হয়ে স্বীকার করেন যে, তারা মাঝেমধ্যে সাধারণ কার্ডধারীদের কাছ থেকে ৯০০ টাকা বস্তা দরে চাল কিনে ঘিওর সরকারি গুদামের শফিক ও সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ৯৬০ থেকে ১০০০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন। তবে কার্ডধারীদের কাছ থেকে চাল কেনার কোনো বৈধ প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।
ঘিওর খাদ্য গুদামের গুদামরক্ষক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এই অবৈধ কেনাবেচার সাথে গুদামের অস্থায়ী ঝাড়ুদার নবীন উজ্জ্বলসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। নবীন উজ্জ্বল স্বীকার করেন যে, ডিলার রফিক মৃর্ধার মাধ্যমেই এই গুদামে চাল আসা-যাওয়া করে এবং এটি একটি নিয়মিত সিন্ডিকেটের কার্যক্রম। তবে ডিলার রফিক মৃর্ধা এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্র ও উপযুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইদ্রিস আলী এমন ব্যক্তিদের মাঝে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির কার্ড বিতরণ করেছেন যাদের এই চালের প্রয়োজন নেই। ফলে কার্ডধারীরা ডিলারের কাছ থেকে চাল তুলে তা কম দামে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন, আর ডিলার ও গুদামের অসাধু চক্র মিলে এই অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে আসছে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ইউপি চেয়ারম্যান মো. ইদ্রিস আলীকে অবগত করেন। চেয়ারম্যানের নির্দেশেই গ্রাম পুলিশ সদস্য গঙ্গাচরণ রাজবংশী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় জনগণ ও সাংবাদিকদের সামনে দুই ভ্যানে থাকা মোট ৩৪ বস্তা চাল গুনে বুঝে নেন। গ্রাম পুলিশ গঙ্গাচরণ চাল বুঝে পাওয়ার বিষয়টি মুঠোফোনে চেয়ারম্যানকে নিশ্চিতও করেন।
কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যায়। গ্রাম পুলিশ গঙ্গাচরণ জানান, চেয়ারম্যান মহোদয়ের নির্দেশেই সেই চালগুলো পুনরায় ওই চাল ব্যবসায়ীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দাবি করেন, গণমাধ্যমকর্মীরা চলে যাওয়ার পর শিহাব ও সাইদুর নামের দুই ব্যক্তি গ্রাম পুলিশকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চালগুলো ছিনতাই করে নিয়ে গেছে এবং তিনি গ্রাম পুলিশকে থানায় মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও চেয়ারম্যান বা ওই গ্রাম পুলিশ চাল উদ্ধারে কিংবা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো ভূমিকা রাখেননি। গ্রাম পুলিশ গঙ্গাচরণ জানান, থানায় কোনো মামলা করা হয়নি কারণ পরবর্তীতে দফাদার রমেলের মাধ্যমে চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে কথা বলে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সিলভিয়া স্নিগ্ধা জানান, এভাবে সরকারি চাল কেনাবেচার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশের পর তিনি দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
মানিকগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আইয়ুব রায়হান এই ঘটনাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ও সম্পূর্ণ অবৈধ উল্লেখ করে বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।