রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল দেশের উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল। প্রতিদিন হাজারো রোগী ও তাদের স্বজন উন্নত চিকিৎসার আশায় এখানে ছুটে এলেও হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে জরুরি বিভাগ, ওয়ার্ড, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কক্ষ এবং হাসপাতাল চত্বরজুড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন তারা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ট্রলি বাণিজ্য, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, রোগী ভাগিয়ে নেওয়া দালালচক্র এবং কমিশননির্ভর ফার্মেসি ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যেই পরিচালিত হলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী রোগী পরিবহনের জন্য ট্রলি ও হুইলচেয়ার ব্যবহারে কোনো অর্থ নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে প্রতিটি ধাপেই টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু জরুরি বিভাগের সামনে ট্রলি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রতি মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রমে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী ও আয়াসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ।
জরুরি বিভাগের ট্রলি কাউন্টারের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ৫৬টি ওয়ার্ডে তিন থেকে চারটি করে ট্রলি বরাদ্দ রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের রোগীদের জন্য ব্যবহারের কথা। জরুরি বিভাগে তিন শিফটে ছয় থেকে সাতজন কর্মী বিনামূল্যে ট্রলি সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া প্রায় ২০০টি ট্রলি রোগীদের ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। এসব ট্রলি নিতে কাউন্টারে ২০০ টাকা জামানত জমা দিতে হয়, যা ট্রলি ফেরত দিলে ফেরত দেওয়া হয়। তবে এক ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করলে অতিরিক্ত প্রতি ঘণ্টার জন্য ৫০ টাকা অফেরতযোগ্য ফি নির্ধারিত রয়েছে। এটিই হাসপাতালের সরকারি নিয়ম।
কিন্তু বাস্তবে নিয়মের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর থেকেই রোগীর স্বজনদের ঘিরে ধরেন ট্রলি পরিচালনাকারীরা। ওয়ার্ড পর্যন্ত রোগী পৌঁছে দিতে গড়ে ১০০ টাকা, দূরের ওয়ার্ড হলে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর রোগীকে অ্যাম্বুলেন্স বা প্রধান ফটক পর্যন্ত পৌঁছে দিতেও একইভাবে টাকা আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অনেক সময় ট্রলি পাওয়া যায় না কিংবা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রলি ট্রিপের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। মাস শেষে যার পরিমাণ প্রায় অর্ধকোটি টাকায় পৌঁছে যায়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওয়ার্ডভিত্তিক বরাদ্দ ট্রলিগুলোও রোগীরা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন না। এসব ট্রলির নিয়ন্ত্রণ একটি সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে। একাধিক সূত্র জানায়, এই চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের কিছু অস্থায়ী ও আউটসোর্সিং কর্মচারীও জড়িত। বিশেষ করে কিছু আয়া নিয়মিত ট্রলি ঠেলে অর্থ আদায় করছেন। অনুসন্ধানে এমন দৃশ্য ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, স্বল্প পারিশ্রমিকের কারণে ডিউটির বাইরে অতিরিক্ত আয়ের জন্য তারা এ কাজ করেন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, বিভিন্ন ওয়ার্ড এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে সক্রিয় রয়েছে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া দালালচক্র। তারা রোগী ও স্বজনদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা চিকিৎসা সময়মতো হবে না কিংবা বাইরে কম খরচে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে। পরে নির্দিষ্ট বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা চিকিৎসকের কাছে রোগীদের নিয়ে যাওয়া হয়। বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কমিশন নেওয়া হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
একইভাবে হাসপাতাল এলাকায় প্রেসক্রিপশন হাতে থাকা রোগীদের লক্ষ্য করে সক্রিয় রয়েছে কমিশনভিত্তিক ফার্মেসি চক্র। হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশে অবস্থান নেওয়া কিছু ব্যক্তি রোগীদের নির্দিষ্ট ওষুধের দোকানে নিয়ে যান। অনুসন্ধানে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ বিক্রির বিপরীতে কমিশন পান তারা। অনেকেই স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন ফার্মেসির হয়ে কমিশনভিত্তিক কাজ করেন এবং হাসপাতালে এ ধরনের আরও অসংখ্য ব্যক্তি সক্রিয় রয়েছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হাসপাতাল থেকে রোগী ছাড়পত্র পাওয়ার পর আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। জরুরি বিভাগের সামনে অবস্থান নেওয়া মধ্যস্বত্বভোগীরা রোগীর স্বজনদের নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে চাপ সৃষ্টি করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টানিয়ে রাখলেও বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া আদায় করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের একটি অংশ কমিশন হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টন করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অনেকেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। একসময় সাধারণ কর্মচারী বা মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের একটি অংশ বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রকে পরিণত হয়েছে।
হাসান আলী নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তার এক বন্ধুর বাবার মরদেহ রাজশাহী থেকে কুষ্টিয়ায় নিতে নির্ধারিত ছয় থেকে সাত হাজার টাকার পরিবর্তে শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে বাধ্য হন।
দুর্ঘটনা, স্ট্রোক, হৃদরোগ কিংবা সংকটাপন্ন রোগীদের স্বজনরা চরম অসহায় অবস্থায় থাকেন। সেই অসহায়ত্বকে পুঁজি করেই অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
কুষ্টিয়া থেকে আসা হারেজ উদ্দিন (৬৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যের সেবা পাওয়ার কথা। অথচ ট্রলি, ওষুধ, পরীক্ষা এবং অ্যাম্বুলেন্স—প্রতিটি ধাপেই অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে। তাহলে সরকারি হাসপাতালে এসে সাধারণ মানুষ কী সুবিধা পেল?
হাসপাতালের প্রধান ফটক, জরুরি বিভাগ এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতেই প্রকাশ্যে এসব কার্যক্রম চললেও কার্যকর অভিযান বা স্থায়ী নজরদারির তেমন কোনো নজির পাওয়া যায় না। মাঝে মধ্যে প্রশাসনিক অভিযান পরিচালিত হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরে আসে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
রোগীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মী ও প্রশাসনিক তদারকি থাকা সত্ত্বেও কেন দালাল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে আসছে না, সেই প্রশ্ন এখন রোগী ও স্বজনদের মুখে মুখে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের বিদায়ী মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেন, রোগীদের ঘিরে এ ধরনের বাণিজ্য অত্যন্ত দুঃখজনক। হাসপাতালের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে ট্রলি বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দালালদের বিরুদ্ধে সময়ে সময়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। তবে হাসপাতালের বাইরের অ্যাম্বুলেন্সগুলোর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আইনগত ক্ষমতা সীমিত।