সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংবাদ প্রকাশ এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে এর সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করছেন—এমন অভিযোগও ক্রমেই সামনে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ফেসবুক পেজ কিংবা ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে গিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ও চাপ সৃষ্টি করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাই কিংবা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, লাইভ বা পোস্ট দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—সাংবাদিকতার পরিচয় আর সাংবাদিকতার নীতিমালা এক বিষয় নয়। একটি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল থাকলেই কেউ পেশাদার সাংবাদিক হয়ে যান না। সংবাদ সংগ্রহে তথ্যের সত্যতা যাচাই, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, নির্ভরযোগ্য সূত্র ব্যবহার এবং জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবে এসব নীতিমালা উপেক্ষা করে ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদকে পরিণত করছে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সামাজিক হয়রানির হাতিয়ারে। একটি অসম্পূর্ণ তথ্য, পুরোনো ভিডিও কিংবা যাচাই না করা অভিযোগ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়তে পারে হাজারো মানুষের কাছে। এতে নির্দোষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সামাজিক ও পেশাগত ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ কেউ ভয়ভীতি দেখিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন, তবে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের জন্যই অত্যন্ত বিব্রতকর।
এদিকে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদ প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যম হলেও এর দায়িত্বশীল ব্যবহার জরুরি। সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন সাংবাদিকের হাতে ক্যামেরা বা মাইক্রোফোন থাকার চেয়ে তার তথ্যের নির্ভুলতা, পেশাগত সততা ও নৈতিক দায়িত্ববোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিচয়, প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, সংবাদকর্মীর দায়িত্ব ও তথ্য যাচাইয়ের বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি ভয়ভীতি, হয়রানি, চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তাহলে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের লাইসেন্স নয়। সংবাদ মানুষের অধিকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি এবং জনস্বার্থ রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকতার নামে যে কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, তেমনি প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ও স্বাধীনতাও রক্ষা করা জরুরি।
এখন প্রশ্ন হলো—ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলের আড়ালে সাংবাদিকতার নামে যারা দৌরাত্ম্য দেখাচ্ছেন, তাদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড যাচাই করবে কে? আর সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক সুবিধা নিলে তার দায় নেবে কে? জনস্বার্থে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রকৃত সাংবাদিকতা ও সাংবাদিক পরিচয়ের অপব্যবহারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।