হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর এলাকার ভেঙে যাওয়া বাঁধের বিপরীতে খোয়াই নদীর পশ্চিম তীরে শায়েস্তাগঞ্জের আলাপুর এলাকায় শর্ত লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলনের অভিযোগে অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজার মেশিনসহ বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়েরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই ২০২৬) দুপুরে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে রাব্বানী চৌধুরী এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্তের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), হবিগঞ্জের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সামিউল আজম, সহকারী রেভিনিউ কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন, সার্ভেয়ার, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এবং শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশের একটি চৌকস দল অংশ নেয়।
অভিযান-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক প্রথম পক্ষ এবং CSCEC7-Spectra JV-এর পক্ষে মেসার্স শামীম বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ইকবাল হোসেন দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে আলাপুর মৌজার জেএল নং-১৫৬, খতিয়ান নং-১, আরএস দাগ নং-৮৯০ এলাকায় বালু উত্তোলনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।
তবে অভিযানে দেখা যায়, চুক্তির আওতাভুক্ত দাগের বাইরে আরএস ৫৭৫ ও ৪০১ নম্বর দাগ থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় আব্দুল কাইয়ুমের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কোনো অনুমতি ছাড়াই কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা চুক্তির ৬ নম্বর শর্তের লঙ্ঘন।
প্রশাসনের তদন্তে আরও উঠে আসে, প্রায় এক মাস ধরে বালু উত্তোলন বন্ধ থাকলেও এর আগে প্রায় চার মাস ধরে ওই এলাকা থেকে ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযানের সময় একটি ড্রেজার নির্ধারিত ৮৯০ নম্বর দাগের বাইরে অবস্থান করতে দেখা যায়।
অভিযোগ রয়েছে, চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে নদীর স্লোপ সংরক্ষণ না করেই বালু উত্তোলন করা হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ছিদ্র করে ড্রেজারের পাইপ প্রবেশ করানো হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ থেকে নির্ধারিত নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা হয়নি। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ও নৌপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি নদীতীর ও সংলগ্ন কৃষিজমিরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
চুক্তি অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী রাতেও ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়েছে, যা চুক্তির ১৬ নম্বর শর্তের লঙ্ঘন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরা জানান, গত ৯ জুলাই খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয় এবং কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। ভেঙে যাওয়া বাঁধের স্থানটি জব্দ করা ড্রেজার দুটি থেকে আনুমানিক ২৫০ থেকে ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত।
অভিযানকালে প্রায় ৩ হাজার ১০০ মিটার পাইপ, দুটি কাটিং সেকশন ড্রেজার এবং তিনটি শ্যালো মেশিন জব্দ করা হয়। জব্দকৃত সব সরঞ্জাম জব্দ তালিকা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড, হবিগঞ্জের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সামিউল আজমের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ড্রেজিং কাজে ব্যবহৃত জব্দকৃত যন্ত্রাংশ দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসন জানায়, অভিযানের সময় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় বিষয়টি মোবাইল কোর্টে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়। তাই মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ৬(৪) ধারা অনুযায়ী নিয়মিত মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ৭(ক) ধারা এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির ২৩ নম্বর শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও তাঁর প্রতিনিধিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান CSCEC7-Spectra JV-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।