বহু জীবনকে প্রায় চার দশক ধরে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষক জামাল উদ্দিন তালুকদার এখন অবসরে। শিক্ষার আলো ও মেধার বিকাশ তৈরি করতে ছিলো তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম , নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে শিক্ষকতা পেশায় অনন্য অবদান রাখার পর কর্মজীবনের ইতি টেনেছেন এ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষাগুরু , দক্ষ প্রশাসক জামাল উদ্দিন তালুকদার।
তিনি বিগত ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ হাজিরহাট উপকূল সরকারি কলেজ থেকে দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের চূড়ান্ত বিদায় নেন । তাঁর এই অবসর কেবল একটি চাকরিজীবনের সমাপ্তি নয় বরং একটি গৌরবময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। যে অধ্যায়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে তিনি রেখেছেন গভীর ও স্থায়ী ভূমিকা।
ইসলামি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য সমন্বয় ঘটেছে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে। তিনি হাজিরহাট হামেদীয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে ১৯৮২-৮৪ সালে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা-য় ভর্তি হয়ে ফাজিল ও কামিল (স্নাতক) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাতেও তিনি মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে সাফল্যের সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের এই বহুমাত্রিক অর্জন তাঁকে পরবর্তীতে একজন গভীর জ্ঞানসম্পন্ন, উদার ও প্রগতিশীল শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষাজীবন শেষে উপকূলীয় জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়ে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে হাজিরহাট উপকূল সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন জামাল উদ্দিন তালুকদার। এরপর দীর্ঘ ৩৩ বছর তিনি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের পাঠদান, জ্ঞানচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে নিবেদিতভাবে কাজ করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তাঁর মেধা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও পাঠদানের অনন্য শৈলী শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।
তবে হাজিরহাট উপকূল সরকারি কলেজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আরও গভীর ও আত্মিক। দীর্ঘ ৩৩ বছর শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে প্রায় দুই বছর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের গুরুদায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শুধু একজন প্রশাসক হিসেবে নয়, বরং একজন উন্নয়নমুখী ও দূরদর্শী শিক্ষানুরাগী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। উপকূলীয় অঞ্চলের তুলনামূলক অনুন্নত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোগত ও একাডেমিক উন্নয়নে তাঁর সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তাঁর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় শিক্ষক কমনরুম, ছাত্র ও ছাত্রীদের পৃথক কমনরুম, মহিলা শিক্ষার্থীদের নামাজের স্থান, রোভার স্কাউট কার্যক্রম ও বিজ্ঞানাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বেদখলে থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫ শতাংশ জমি উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
এসব উদ্যোগের কারণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের কাছে তিনি একজন কর্মঠ, সৎ ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে বিশেষভাবে প্রশংসিত হন। তাঁর কাছে প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল কেবল দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা নয়; বরং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আরও আধুনিক, কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে গড়ে তোলার সুযোগ।
জামাল উদ্দিন তালুকদারের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো পদ-পদবি কিংবা প্রশাসনিক সাফল্য নয়—বরং তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি; শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনেকেই আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পেশায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের কাছে জামাল উদ্দিন তালুকদার শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি একজন শিক্ষাগুরু, পথপ্রদর্শক ও জীবনের নানা বাঁকে অনুপ্রেরণার উৎস।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও জামাল উদ্দিন তালুকদারের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। তিনি ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ ৩৩ বছরের শিক্ষকতা, দুই দফা উচ্চশিক্ষার বিস্তৃত অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে জামাল উদ্দিন তালুকদারের কর্মজীবন এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়। ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নিলেও শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর শিক্ষা, আদর্শ ও কর্মের প্রভাব কখনো অবসর নেবে না।
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর জ্ঞান, একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর মমতা, একজন প্রশাসক হিসেবে তাঁর দক্ষতা এবং একজন সমাজসচেতন মানুষ হিসেবে তাঁর দায়িত্ববোধ তাঁকে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে দীর্ঘদিন অমলিন করে রাখবে বলে আশাবাদী সুসশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গরা।
চার দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য পথচলার শেষে শিক্ষাবিদ জামাল উদ্দিন তালুকদারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা। তাঁর অবসরজীবন হোক সুস্থতা, শান্তি, সম্মান ও সাফল্যে পরিপূর্ণ— এমনটাই স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ (সমাজ সেবক, সামাজিক সংগঠক, সাংবাদিকবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি) তাঁর অসংখ্য শিক্ষার্থী,সহযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশা।