ভোরের আজানের ধ্বনি তখনও বাতাসে ভাসছে, শহরের অধিকাংশ মানুষ তখন ঘুমের শেষ প্রহরে। কিন্তু ছোট্ট একটি টিনের ঘরে একজন মানুষের ঘুম অনেক আগেই ভেঙে গেছে।
চুপচাপ মুখে পানি দিয়ে, পুরোনো কাপড়টা পরে, স্ত্রী আর ঘুমন্ত সন্তানের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে।
বের হওয়ার আগে তার চোখে কোনো স্বপ্ন থাকে না, থাকে শুধু একটি হিসাব, আজ কত টাকা আয় করতে পারলে রাতের খাবারটা নিশ্চিত হবে।
কাঁধে ভারী বোঝা তুলে যখন সে রাস্তায় নামে, তখন শহর মাত্র জেগে উঠছে। তার হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে আরেকটি যুদ্ধ, এই যুদ্ধ কারও বিরুদ্ধে নয়, এই যুদ্ধ অভাবের বিরুদ্ধে, ক্ষুধার বিরুদ্ধে, ভাগ্যের বিরুদ্ধে।
মানুষ তাকে “ফেরিওয়ালা” বলে চেনে। কেউ তাকে সবজি বিক্রেতা বলে, কেউ কাপড়ওয়ালা, কেউ খেলনা বিক্রেতা, কিন্তু এই পরিচয়গুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকে আরেকটি পরিচয়।
সে একজন বাবা, একজন স্বামী, একজন সন্তানের স্বপ্ন, একজন বৃদ্ধ মায়ের ভরসা। রোদের তাপে যখন শহরের পিচ গলে যায়, তখন তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে, সেই ঘাম শুধু শরীরের ক্লান্তি নয়, সংসারটাকে টিকিয়ে রাখার মূল্য।
মানুষ ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটু স্বস্তি খোঁজে, কিন্তু সে জানে, যতক্ষণ পা চলবে ততক্ষণই আয় হবে, তাই ক্লান্তি গিলে সে আবারও হাঁটে।কখনো দরজায় কড়া নাড়তেই কেউ হাসিমুখে ডাকে, আবার কোনো দরজা খুলেই বন্ধ হয়ে যায় তার মুখের ওপর। কেউ বলে, “এখন দরকার নেই।” কেউ এমনভাবে ফিরিয়ে দেয়, যেন সে মানুষ নয়, এক টুকরো বিরক্তি।
তবু সে রাগ করে না।কারণ জীবন তাকে শিখিয়েছে, অপমানে পেট ভরে না, কিন্তু ধৈর্য কখনো কখনো সংসার বাঁচিয়ে রাখে।
হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে আসে।বৃষ্টি নামে, মানুষ ছুটে যায় আশ্রয়ের খোঁজে, সে দাঁড়িয়ে থাকে পণ্যগুলো বাঁচানোর চেষ্টা করে।
কারণ এগুলোই তার মূলধন।এগুলো নষ্ট হলে শুধু আজকের দিন নয়, আগামীকালও অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
সারাদিন ঘুরে যখন বিকেলের আলো ফিকে হয়ে যায়, তখন তার পায়ের শক্তি কমে আসে, তবুও শেষবারের মতো সে ডাক দেয়, হয়তো আরেকটি বিক্রি হবে।
হয়তো সেই টাকাতেই সন্তানের জন্য একটি ডিম কেনা যাবে, কিংবা বৃদ্ধ বাবার ওষুধ।
রাতের অন্ধকারে বাড়ি ফিরে সন্তান যদি দৌড়ে এসে জিজ্ঞেস করে, বাবা, আজ কী আনছো?সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার শক্তি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধনীর কাছেও নাও থাকতে পারে।
কিন্তু একজন “ফেরিওয়ালা” চেষ্টা করে, খালি হাতে হলেও মুখে হাসি রাখতে।কারণ সে জানে, তার মুখের হাসিটুকুই পরিবারের সাহস।আমরা প্রায়ই তার সঙ্গে দরাদরি করি, পাঁচ-দশ টাকা কমানোর জন্য অনেক সময় দীর্ঘ তর্ক করি।
কিন্তু কখনো কি ভেবেছি, সেই সামান্য টাকাটাই হয়তো তার সন্তানের স্কুলের খাতা, মায়ের ওষুধ, কিংবা রাতের একমুঠো চালের দাম? পৃথিবীর ইতিহাসে হয়তো তার নাম লেখা থাকবে না, কোনো সংবাদপত্র তার সংগ্রামের খবর ছাপাবে না, তার জীবন নিয়ে কেউ সিনেমা বানাবে না, তবুও প্রতিদিন সে এমন এক যুদ্ধ জিতে যায়, যে যুদ্ধের নাম-বেঁচে থাকা।
সে জানে, তার থেমে যাওয়ার অধিকার নেই- কারণ সে থামলে শুধু একজন মানুষ থামে না থেমে যায় একটি চুলার আগুন, থেমে যায় একটি শিশুর পড়াশোনা, থেমে যায় একজন মায়ের চিকিৎসা, থেমে যায় একটি পরিবারের শত ছোট ছোট স্বপ্ন।
তাই প্রতিটি সকাল তার কাছে নতুন সূর্য নয়, নতুন দায়িত্ব।
প্রতিটি রাস্তা নতুন গন্তব্য নয়, নতুন সংগ্রাম।প্রতিটি হাঁক শুধু ব্যবসার ডাক নয়, জীবনের ঘোষণা,”আমি এখনো হার মানিনি।”
এই শহরের ব্যস্ত রাস্তায় যখন কোনো ফেরিওয়ালা’র ডাক কানে আসে, একবার অন্তত তার দিকে তাকিয়ে দেখুন, হয়তো তার কাঁধে শুধু একটি ঝুড়ি নেই, সেখানে ভর করে আছে একটি পুরো সংসার।
আর তার প্রতিটি পদক্ষেপে লুকিয়ে আছে এমন এক নীরব বীরত্ব, যার কথা খুব কম মানুষই মনে রাখে।
কারণ পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধগুলো সব সময় বন্দুক দিয়ে লড়া হয় না।
কিছু যুদ্ধ প্রতিদিন খালি পায়ে, ঘামে ভেজা জামায়, অপমান চেপে রেখে, ক্ষুধাকে সঙ্গী করে লড়তে হয়-
আর সেই যোদ্ধাদের একজন-আমাদের অতি পরিচিত, অথচ সবচেয়ে অবহেলিত রাস্তার “ফেরিওয়ালা”।