উপকূল সুরক্ষা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদীতীর সংরক্ষণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সমন্বিত উদ্যোগ| একদিকে বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস, অন্যদিকে পাহাড়ি ঢল ও নদীভাঙন—প্রাকৃতিক দুর্যোগের বহুমুখী ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। প্রতিবছর বর্ষা ও দুর্যোগ মৌসুমে নদী ও উপকূলের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, রাস্তাঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এই বাস্তবতায় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীতীর সংরক্ষণ ও উপকূল সুরক্ষায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এসব কর্মকাণ্ডে প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন খ. ম. জুলফিকার তারেক।বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম পওর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করায় এ অঞ্চলের নদী, উপকূল ও পানি ব্যবস্থাপনার বাস্তব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাঁর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
উপকূল রক্ষায় বড় প্রকল্প দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও বাঁশখালী উপকূলীয় এলাকা দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। সাগরের জোয়ার, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ত পানির প্রবেশ থেকে এসব এলাকা রক্ষায় টেকসই বাঁধ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আনোয়ারা ও বাঁশখালীর উপকূল রক্ষা প্রকল্পে প্রায় ৮৭৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে টেকসই উপকূল রক্ষা বাঁধসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ ও সংশ্লিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে অরক্ষিত উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকে খ. ম. জুলফিকার তারেকের নেতৃত্ব ও তদারকি দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূল সুরক্ষা কার্যক্রমে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। নদীভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ও সিসি ব্লক চট্টগ্রামের বিভিন্ন নদীতীরবর্তী এলাকায় বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের সময় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় নদীতীর সংরক্ষণে জিওব্যাগ, সিসি ব্লক ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার সাঙ্গু ও ডলু নদী, রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী ও হালদা নদীসহ বিভিন্ন ভাঙনপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা কাজ পরিচালিত হচ্ছে।নদীর গতিপ্রকৃতি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ার-ভাটার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়নে প্রকৌশলগত তদারকিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।হালদা ও ধুরং নদী-খালেও গুরুত্ব চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ নদী হালদা ও বিভিন্ন খাল-নদীর তীর সংরক্ষণ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। হালদার পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে নদীতীর রক্ষার পাশাপাশি পানি প্রবাহ ও নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ধুরং খালসহ অন্যান্য জলাধার ও পানি প্রবাহের পথের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয় বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।সাতকানিয়া-চন্দনাইশে পাহাড়ি ঢলের চাপ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও চন্দনাইশে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় প্রতিবছরই বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার, নদীতীর সংরক্ষণ ও পানি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রকল্প ও স্কিম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পাহাড়ি ঢলের আকস্মিক চাপ মোকাবিলায় টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।কক্সবাজার উপকূলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কক্সবাজার উপকূল। সমুদ্রসৈকতের ভাঙন, জোয়ারের পানি এবং উপকূলীয় দুর্যোগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রক্ষায় প্রায় ৬২৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত উদ্যোগের লক্ষ্য সমুদ্রভাঙন মোকাবিলা এবং উপকূলীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সুরক্ষায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বাঁধের পাশাপাশি পানি নিষ্কাশনেও নজর শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া উপকূলীয় এলাকার স্থায়ী সুরক্ষা সম্ভব নয়। এ কারণে স্লুইস গেট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল-নালা পুনঃখনন এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাঁশখালীর অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশন ও বাঁধ সংস্কার নিয়ে নতুন প্রকল্প প্রস্তাবের কথাও সামনে এসেছে। এর আওতায় জলকদর খাল পুনঃখনন, অভ্যন্তরীণ বাঁধ সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় বাঁধের ঢাল সুরক্ষার মতো কাজ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যায়।
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম মহানগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানেও পানি ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রমের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।খাল, ড্রেনেজ ও পানি প্রবাহের পথ সচল রাখা এবং জলাবদ্ধতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।কর্ণফুলী নদী তীর রক্ষায় পরিকল্পনা চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র কর্ণফুলী নদী। নদীভাঙন থেকে নদীতীরবর্তী বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা রক্ষায় তীর সংরক্ষণের বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে শুধু তাৎক্ষণিক ভাঙন ঠেকানো নয়, ভবিষ্যতে নদীর গতিপথ ও তীরের স্থায়িত্ব বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।মাঠপর্যায়ের তদারকিতে গুরুত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড় প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি ভাঙন প্রতিরোধের কাজও গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে কোথাও বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা নদীতীরে হঠাৎ ভাঙন দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন বিভিন্ন পওর বিভাগের প্রকৌশলীদের কার্যক্রম সমন্বয়, প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পানি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারেও আগ্রহ রয়েছে এ অঞ্চলের প্রকৌশলীদের। খ. ম. জুলফিকার তারেক চীন সরকারের আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করে Hydraulic Elevator Dam (HEM) প্রকল্পের কোয়ালিটি কন্ট্রোল ও টেকনিক্যাল ইন্সপেকশন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।আধুনিক পানি নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রযুক্তির সঙ্গে এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিনিময় ভবিষ্যতে দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে সহায়ক হতে পারে।
উন্নয়নের কেন্দ্রে মানুষের নিরাপত্তা চট্টগ্রাম ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনার প্রতিটি প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা। একটি বাঁধের দুর্বলতা যেমন একটি পুরো জনপদকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, তেমনি নদীভাঙন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেড়ে নিতে পারে বসতভিটা ও ফসলি জমি। এ কারণে টেকসই বাঁধ, নদীতীর সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও উপকূল সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
এই বাস্তবতায় খ. ম. জুলফিকার তারেকের নেতৃত্বে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পানি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা, উপকূল সুরক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর ও টেকসই হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে প্রকল্পের মানসম্মত বাস্তবায়ন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ের কার্যকর তদারকির ওপর।