১৩ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে প্রিয় রোজান, শোকে পাথর বাবা সাজ্জাদুল মেরাজ
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
মায়ের ডাক
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
একজন পিতার জীবনে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত কোনটি—সন্তানের মৃত্যুর সংবাদ শোনা, নাকি মৃত্যুর সঙ্গে সন্তানের প্রতিটি মুহূর্তের লড়াই চোখের সামনে দেখা?
সম্ভবত দুটোই। তবে দীর্ঘ ১৩ দিন আইসিইউর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একজন বাবার প্রতিটি মুহূর্ত যে কী অসহনীয় অপেক্ষার মধ্য দিয়ে কেটেছে, তা কেবল সেই বাবাই জানেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মেরাজের আদরের বড় ছেলে প্রিয় মিনহাজুল ইসলাম রোজান দীর্ঘ ১৩ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে আজ না ফেরার দেশে চলে গেছে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
রোজানের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, তাঁর স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পরিচিতজনদের জন্যও গভীর শোকের সংবাদ। কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটি নেমে এসেছে একজন পিতার হৃদয়ে।
১৩ দিন—একজন বাবার কাছে ১৩ বছরের মতো
১৩ দিন—ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো খুব বেশি সময় নয়। কিন্তু সন্তানের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাবার কাছে এই ১৩টি দিন যেন ১৩টি দীর্ঘ বছর।
আইসিইউর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেরাজ হয়তো প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহর কাছে একটি মাত্র প্রার্থনাই করেছেন—
“হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।”
কখনো চিকিৎসকের কথায় আশার আলো জ্বলে উঠেছে। কখনো আবার অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে উঠেছে। কখনো সন্তানের জন্য দোয়া করতে করতে চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে। কখনো হয়তো নিঃশব্দে আল্লাহর কাছে নিজের কষ্টের কথা বলেছেন।
একজন বাবা সন্তানের যন্ত্রণা নিজের শরীরে নিতে পারেন না। সন্তান অসুস্থ হলে তাঁর অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়। তিনি সন্তানের পাশে থাকতে পারেন, হাত ধরে রাখতে পারেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেন, দোয়া করতে পারেন—কিন্তু সন্তানের কষ্টটুকু নিজের শরীরে নিয়ে নিতে পারেন না।
এই অসহায়ত্বই হয়তো একজন পিতার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।
আশার শেষ প্রহরেও ছিল প্রার্থনা
১৩ দিন ধরে রোজানের জন্য পরিবারের মানুষ, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অপেক্ষা করেছেন।
হয়তো প্রতিটি সকাল শুরু হয়েছে নতুন আশায়—
আজ হয়তো রোজান চোখ খুলবে।
হয়তো প্রতিটি ফোনকলের শব্দে বুক কেঁপে উঠেছে। হয়তো চিকিৎসকের কক্ষ থেকে কেউ বেরিয়ে এলে সবার চোখ তাঁর দিকে ছুটে গেছে। একটি ভালো খবরের জন্য কতটা আকুল অপেক্ষা ছিল—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষা পরিণত হলো অশ্রুসিক্ত বিদায়ে।
বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ—এর চেয়ে ভারী দৃশ্য আর কী হতে পারে?
যে সন্তানকে একদিন বাবা কোলে তুলে নিয়েছিলেন, হাঁটতে শিখিয়েছেন, আদর করেছেন, শাসন করেছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন—একদিন সেই সন্তানের নিথর দেহই বাবার সামনে শেষ বিদায়ের জন্য শুয়ে থাকবে—এ বাস্তবতা কোনো পিতার জন্যই সহজ নয়।
যে কাঁধে সন্তানকে নিয়ে ঘুরেছেন, সেই কাঁধেই আজ সন্তানের জানাজা ও দাফনের ভার।
যে হাত সন্তানের মাথায় স্নেহের পরশ দিয়েছে, সেই হাতই আজ সন্তানের শেষ বিদায়ে মাটির দিকে এগিয়ে যাবে।
এর চেয়ে নির্মম সত্য আর কী হতে পারে?
একজন সন্তান মানে একজন বাবার স্বপ্ন
একজন সন্তান শুধু একটি পরিবারের সদস্য নয়। একজন সন্তানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন বাবার বহু বছরের স্বপ্ন।
রোজানকে ঘিরেও নিশ্চয়ই সাজ্জাদুল মেরাজের কত স্বপ্ন ছিল। ছেলের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা, কর্মজীবন, প্রতিষ্ঠা—সবকিছু নিয়ে একজন বাবার মনে কত পরিকল্পনা থাকে।
সন্তানের মুখের হাসি একজন বাবার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ।
আজ সেই হাসি নেই।
আজ আছে স্মৃতি।
আছে ছবি।
আছে সন্তানের ব্যবহৃত জিনিসপত্র।
আছে অসংখ্য না বলা কথা।
আর আছে এমন এক শূন্যতা, যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়।
কিছু কান্না চোখ দিয়ে বের হয় না
সাজ্জাদুল মেরাজ আজ হয়তো কাঁদছেন। কিন্তু একজন সন্তানের মৃত্যুতে একজন বাবার বুকের ভেতর যে কান্না জমে থাকে, তার সবটুকু চোখের পানি হয়ে বের হয় না।
কিছু কান্না মানুষের বুকের গভীরে জমে থাকে।
কিছু ব্যথা মুখে প্রকাশ করা যায় না।
কিছু শূন্যতা কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না।
সন্তান হারানোর ব্যথা তেমনই এক শূন্যতা।
আজ মেরাজ শুধু তাঁর বড় ছেলেকে হারাননি; হারিয়েছেন তাঁর জীবনের একটি অংশ, তাঁর স্বপ্নের একটি অধ্যায়, তাঁর হৃদয়ের একটি টুকরো।
রোজান নেই, কিন্তু স্মৃতিতে থাকবে চিরকাল
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু ভালোবাসার মানুষের হৃদয় থেকে চলে যেতে পারে না।
রোজান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর হাসি, তাঁর কথা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়—সবকিছুই পরিবারের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।
একজন পিতার হৃদয়ে সন্তান কখনো মৃত হয় না।
সন্তান থাকে স্মৃতিতে।
সন্তান থাকে ভালোবাসায়।
সন্তান থাকে অশ্রুতে।
সন্তান থাকে প্রতিটি দোয়ায়।
আর রাতের নিস্তব্ধতায় একজন বাবা হয়তো সন্তানের স্মৃতির সঙ্গে নীরবে কথা বলবেন।
মায়ের ডাকের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও সমবেদনা
নিখোঁজ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো মায়ের ডাক-এর পক্ষ থেকে প্রিয় রোজানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি।
শোকসন্তপ্ত পিতা সাজ্জাদুল মেরাজ, পরিবারের সদস্য এবং রোজানের স্বজনদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।
এই কঠিন সময়ে কোনো কথাই হয়তো একজন পিতার বুকের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। তবুও আমরা বিশ্বাস করি—মহান আল্লাহর রহমতই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
প্রিয় রোজানের জন্য দোয়া
হে মহান আল্লাহ,
১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা প্রিয় মিনহাজুল ইসলাম রোজানের প্রতিটি কষ্টকে তাঁর জন্য নেকির কারণ করে দিন।
তাঁর জীবনের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন।
তাঁর কবরকে নূরে ভরে দিন।
কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন।
তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ স্থান দান করুন।
হে আল্লাহ,
শোকাহত পিতা সাজ্জাদুল মেরাজকে সবর-এ-জামীল দান করুন। তাঁর বুকের এই অসহনীয় শোক বহন করার শক্তি দিন।
যে শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হবে না, সেই শূন্যতা সহ্য করার ধৈর্য দিন।
পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে আপনার রহমতের ছায়ায় রাখুন।
তাঁদের চোখের অশ্রুকে রহমতের কারণ করুন এবং আখিরাতে প্রিয় সন্তান রোজানের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হওয়ার সৌভাগ্য দান করুন।
প্রিয় রোজান, তোমার বিদায়ে আজ একজন বাবা নিঃস্ব, একটি পরিবার শূন্য, আর অসংখ্য হৃদয় ভারাক্রান্ত।
তুমি নেই—কিন্তু তোমার স্মৃতি থাকবে।
তুমি নেই—কিন্তু তোমাকে ঘিরে বাবার ভালোবাসা থাকবে।
তুমি নেই—কিন্তু প্রতিটি দোয়ায় তোমার নাম থাকবে।
আল্লাহ তোমাকে তাঁর অসীম রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন।
আল্লাহুম্মাগফির লাহু, ওয়ারহামহু।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
হে আল্লাহ, প্রিয় মিনহাজুল ইসলাম রোজানকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং শোকসন্তপ্ত পিতা সাজ্জাদুল মেরাজসহ পরিবারের সবাইকে অসীম ধৈর্য ও সবরে জামীল দান করুন।
আমিন, ইয়া রাব্বাল আলামিন।
মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
মায়ের ডাক