চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার এক তরুণ উদ্যোক্তার নাম মু. শহীদুল ইসলাম ইবন। উচ্চশিক্ষিত এই যুবক এক সময় বেচে নিয়েছিলেন চাকরির পথ। অনার্স এ পড়াশোনা অবস্থায় কয়েক বছর একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন তিনি। চাকরির স্থির জীবন, নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডি আর সীমাবদ্ধ সুযোগের ভেতর থেকেও নিজের ভেতরের স্বপ্নকে তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তার ভেতরে সবসময় কাজ করত, নিজের কিছু করার তীব্র ইচ্ছা, আত্মনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন। অবশেষে একসময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেন শহীদুল ইসলাম। এম.এস.এস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করার পর স্থায়ী চাকরি ছেড়ে ফিরে আসেন গ্রামের মাটিতে। শুরুটা ছিল অনেক কঠিন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি সমাজের অনেকেই তার এই সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে নেননি। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছিলেন, “এত পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত গরুর খামার?” কিন্তু এসব কথায় তিনি থেমে যাননি।
শুরুটা ২০২২ সাল থেকে! শহীদুল ইসলাম ইবনের মতে, মাত্র ৪টি হলস্টেন ফ্রিজিয়ান গাভী দিয়ে তিনি এই উদ্যোগ শুরু করেন। শুরুতে পুঁজি ছিল মাত্র ৬ লক্ষ টাকা, যা তিনি গাভী কেনার জন্য সংগ্রহ করেন তার মামার কাছ থেকে। সেই ছোট্ট পুঁজি ও সীমিত সম্পদ নিয়েই শুরু হয় এক স্বপ্নের পথচলা। তিনি জানান, তখন অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিল। চাকরি ছেড়ে খামার করা নিয়ে পরিবার ও সমাজের অনেকের সন্দেহ ছিল। কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল একটাই, নিজের কিছু তৈরি করতে হলে ঝুঁকি নিতে হয়।
শহীদুল ইসলাম পটিয়া সরকারি কলেজে অনার্সে পড়াশোনা করার সময়ই চাকরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি T.K. গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান মর্ডান পলি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে প্রশাসনিক (এডমিন) বিভাগে কাজ করতেন। পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। মাস্টার্স শেষ করার পর সামনে ছিল ব্যাংকে চাকরির সুযোগ। তবে তিনি ব্যাংক বা স্থায়ী চাকরির পথে না গিয়ে মামার পরামর্শে গরুর খামার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, “চাকরির চেয়ে ব্যবসায়ের স্বাধীনতা বেশি। নিজের পরিশ্রমের ফল নিজের হাতে পাওয়া যায়। এটাই আমাকে উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত করেছে।”
বর্তমানে তার খামারটি “মেসার্স এহসান এগ্রো ফার্ম লিমিটেড” নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে প্রায় ৮০টি গরু, যার মধ্যে রয়েছে দুগ্ধজাত গাভী এবং মোটাতাজা করার জন্য বিভিন্ন জাতের গরু। খামারটি শুধু কোরবানির মৌসুমে নয়, সারা বছরই দুধ উৎপাদন ও গরু পালন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারে নিয়মিত মাংস এবং দুধ সরবরাহের মাধ্যমে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খামারের পরিবেশ অত্যন্ত যত্নসহকারে পরিচালিত। খোলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশে গরু পালন করা হয়, যাতে পশুগুলো সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে বড় হতে পারে। পাশাপাশি খামারটি দালালমুক্ত ও হাসিলমুক্ত পরিবেশে পরিচালিত হওয়ায় ক্রেতারা সরাসরি স্বস্তির সঙ্গে গরু কিনতে পারেন।
বর্তমানে এই খামারে ৬ জন কর্মচারী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন মুহাম্মদ নূর উদ্দিন। তিনি বলেন, “আমরা এখানে একটা পরিবারের মতো থাকি। খামারের মালিক ইবন ভাই আমাদের নিজের পরিবারের সদস্যদের মতো দেখেন।” প্রতিমাসে কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করা হয় বলে জানান শহীদুল ইসলাম ইবন। তিনি কর্মচারীদের ভালো রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। খামারের কর্মীরা গরুর খাবার প্রস্তুত, পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি কাজই অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে পরিচালিত হয়।
স্থানীয়রা বলেন, শহীদুল ইসলামের এই উদ্যোগ এলাকার তরুণদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। একজন শিক্ষিত তরুণ চাকরির নিরাপদ জীবন ছেড়ে এভাবে খামার গড়ে তুলেছেন, এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। অনেকেই মনে করেন, তার এই উদ্যোগ শুধু নিজের জীবনের পরিবর্তন আনেনি, বরং এলাকার কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে।
পটিয়ার আশিয়া ইউনিয়নের বাথুয়া গ্রামের শান্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এই খামার এখন জানান দিচ্ছে এক তরুণের স্বপ্ন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং সফলতার বাস্তব গল্প। চারটি গরু থেকে শুরু করে আজ ৮০টি গরুর এই খামার প্রমাণ করে সাহস, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাস থাকলে চাকরির বাইরে গিয়েও নিজের ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব।