গত ১১ মে ২০২৬ পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি উদ্ভূত নানাবিধ হুমকি এবং চলমান ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে “চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্ট পলিসি ফোরাম”-এর উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস স্টুডেন্ট পলিসি ফোরামের মুখপাত্র রিয়াজুল হাসানের সঞ্চালনায় এবং সমন্বয়ক রাসেল মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির দীর্ঘ সময় পরও পাহাড়ে স্থিতিশীলতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচার এবং বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট বিভিন্ন ষড়যন্ত্র দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এসময় প্রধান অতিথি বিচারপতি মো. ফারুক (এম ফারুক) বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন এবং বিদ্যমান কিছু বিতর্কিত আইনি কাঠামোর কারণে সেখানে বসবাসরত প্রায় ৫৮ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শান্তিচুক্তির পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি ও সেনাবাহিনীর সদস্য আত্মত্যাগ করেছেন। অন্যদিকে সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বার্ষিক প্রায় ৭০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির সংস্কৃতি উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে পিসিজেএসএস প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত দেশবিরোধী অপপ্রচার পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশেষ অতিথি বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. আব্দুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটেছে। এছাড়া প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এত উন্নয়নের পরও একটি গোষ্ঠী কেন দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্তমান বাস্তবতা, বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ এবং একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও উপাত্ত উপস্থাপন করেন। তারা বলেন, বর্তমান বিশ্বে তথ্যের পাশাপাশি “ন্যারেটিভ যুদ্ধ” অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুতেও বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। মানবাধিকার, নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, আদিবাসী পরিচয় ও আঞ্চলিক সংঘাতকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের তথ্য ও প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করছে।
বক্তারা আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল ও বহুস্তরীয়। এখানে ভূমি বিরোধ, প্রশাসনিক জটিলতা, আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং উন্নয়ন কার্যক্রম—সবকিছু মিলিয়ে একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনেক সময় এসব বিষয় একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তারা দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, তথ্যনির্ভর গবেষণা এবং ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, এ ধরনের আলোচনা দেশি-বিদেশি অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্রের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরতে সহায়ক হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল নাগরিকের সমঅধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাছুম, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, পার্বত্য নিউজ-এর সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশ, মেজর (অব.) জাকির হোসাইন, সাংবাদিক ও গবেষক এইচ এম ফারুক, সিএইচটি, সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক মো. মোস্তফা আল ইহযায, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ, কর্নেল অবঃ আসাদুজ্জামান কর্নেল অবঃ মো. আইয়ুব, এস এম জহিরুল ইসলাম, শাহ সুফি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল হান্নান আল হাদী, শেখ আহম্মদ রাজু, ইঞ্জিনিয়ার শাহাদাৎ ফরাজী সাকিব, জিয়াউল হক, সাংবাদিক নেতা তাইজুল ইসলাম, মাওলানা মোঃ শাফিউর রহমান কাজি, সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিবৃন্দ।