দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে মাঠ রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়া বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সিনিয়র সদস্য ও সাবেক জনপ্রতিনিধি বেগম মেহেরুন নেছা হককে সংরক্ষিত মহিলা এমপি পদে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি উঠেছে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণের পক্ষ থেকে। দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মতে, দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সংগ্রাম ও জনসেবার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে মূল্যায়ন করা উচিত।
জানা যায়, প্রায় ২৭ বছর ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় থাকা এই প্রবীণ নেত্রী নানা সময় রাজনৈতিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ৭২ বছর বয়সেও তাকে তিনবার কারাবরণ করতে হয়েছে। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে চার মাস কারাবন্দি থাকাকালে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে আসেন তিনি। সেই সময় তার পরিবারও ছিল কঠিন নির্যাতনের শিকার।
মিরপুরের পল্লবীতে অবস্থিত তার বাসভবনটি দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি এবং ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের মহড়ার কারণে আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। তবুও রাজনৈতিক আদর্শ থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি।
পরিবারের সদস্যরাও রাজনৈতিক কারণে নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার বড় ছেলে নয়ন বাঙালী, যিনি ভিন্নধারার সমাজকর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত, ফ্যাসিবাদী আমলে একাধিকবার গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। তাকে ক্রসফায়ারের তালিকাভুক্ত আসামি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। একাধিকবার গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে তিনি গুরুতর শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং পরে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি একসময় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য সম্পাদক এবং একটি বৃহৎ জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন প্রায় দেড় দশক আগে।
তার ছোট ছেলে নাদিম বাঙালীও বড় ভাইয়ের আদর্শ অনুসরণ করে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও বড় ভাইকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালে তাকে গ্রেফতার করে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে সেই নির্যাতনের কারণে তাকেও দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।
রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও পারিবারিক কষ্টের মধ্যেও মিরপুর-পল্লবীর মানুষের পাশে থেকে কাজ করে গেছেন বেগম মেহেরুন নেছা হক। নিজের সন্তানরা পাশে না থাকলেও এলাকার হাজারো মানুষ তাকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। স্থানীয়দের মতে, তার হাত ধরেই মিরপুর-পল্লবী এলাকায় একটি শক্ত ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে।
তিনি চারবার ঢাকা সিটি করপোরেশনের কমিশনার নির্বাচিত হয়ে প্রায় ২৫ বছর ধরে জনগণের সেবা করেছেন। স্থানীয় উন্নয়ন, সামাজিক কার্যক্রম এবং দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করতে তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। দলীয় সিদ্ধান্তে তাকে এমপি মনোনয়ন না দেওয়া হলেও তিনি হাসিমুখে দলীয় প্রার্থী আমিনুল হকের পক্ষে মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, এমন ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেত্রীকে সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন দিলে তা হবে দলীয় ত্যাগের মূল্যায়ন। তাদের মতে, যারা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থেকে জনগণের জন্য কাজ করেছেন এবং কঠিন সময়েও দলের পাশে থেকেছেন—তাদেরই মূল্যায়ন করা উচিত।
এ বিষয়ে নয়ন বাঙালী বলেন, “আমাদের পরিবার কখনো দলের কাছে কিছু চায়নি। আমরা শুধু চাই জুলুমবাজদের বিচার হোক এবং জিয়া পরিবারের নেতৃত্বে দল শক্তভাবে টিকে থাকুক। যদি আমার মা সংরক্ষিত মহিলা এমপি হিসেবে দায়িত্ব পান, তাহলে আমাদের আর কোনো চাওয়া থাকবে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে যাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে মাঠে রাজনীতি করে ত্যাগ স্বীকার করেছেন—দল তাদের মূল্যায়ন করলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে।
দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, অতীতের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বিবেচনা করে বিএনপি এবার সংরক্ষিত মহিলা এমপি মনোনয়নের ক্ষেত্রে বেগম মেহেরুন নেছা হকের মতো নেত্রীদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে।