ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জে ভাঙচুর, দখলদারিত্ব ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। তার একাধিক কর্মকাণ্ড নিয়ে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিএনপির ভেতরেও অসন্তোষ দিন দিন তীব্র হচ্ছে।
বিশেষ করে সাবেক মেয়র ও নারায়ণগঞ্জের জনপ্রিয় নেতা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নিয়ে টিপুর বিতর্কিত মন্তব্য এবং সাংবাদিক নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আক্রমণ নতুন করে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এসব ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের এক সভায় সংগঠনের সভাপতি আবু সাউদ মাসুদ সাবেক মেয়র আইভীর গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, তিনি গডফাদারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় রাজনৈতিকভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অপকর্মের অভিযোগ নেই। এই বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিপু আবু সাউদ মাসুদকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে কটাক্ষ করেন, যা সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
সাধারণ মানুষের একাংশ টিপুর এই অবস্থানকে ব্যক্তিগত আক্রোশ ও রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে দেখছেন। তার ফেসবুক পোস্টে শামীম আহমেদ নামে এক ব্যক্তি মন্তব্য করে টিপুর নৈতিকতা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই প্রশ্ন তোলেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে টিপুর বিরুদ্ধে ওসমান পরিবারের সঙ্গে গোপন আঁতাতের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শামীম ওসমানের মূল অবস্থান ‘হীরা মহল’ অক্ষত রেখে তার সৎ ভাইদের পৈত্রিক বাড়ি ‘বায়তুল আমান’ ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেন টিপু। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে মূল সম্পত্তি রক্ষার কৌশল হিসেবেই এই ঘটনা ঘটানো হয়। শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাজনুর সঙ্গে টিপুর পুরনো ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আরও অভিযোগ করছেন, বিএনপিকে দুর্বল করতে গঠিত বিএনএফ (বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফ্রন্ট)-এর নারায়ণগঞ্জে অন্যতম সংগঠক ছিলেন টিপু নিজেই। তিনি একসময় বিএনএফ-এর জেলা আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তার প্ররোচনায় তরুণ রাজনীতিক মাসুকুল ইসলাম রাজীব বিএনএফ-এর সদস্য সচিব হিসেবে যুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে এই সংশ্লিষ্টতার কারণে জেলা বিএনপির সম্মেলনে রাজীব শোকজের মুখে পড়েন এবং সাধারণ সম্পাদক পদের দৌড় থেকে ছিটকে যান। অথচ বিএনএফ-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকেও টিপু মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন—এ নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, টিপুর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি থাকাকালীন গুরুতর অভিযোগের কারণে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল।
দলের ভেতরেও তার অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকায় নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতে গণপিটুনির শিকার হন তিনি। পদ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিযোগে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। পরে ৪ ডিসেম্বর পরিবহন শ্রমিকরাও তার বিরুদ্ধে রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল করে।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক চর্চার আহ্বান জানাচ্ছেন, তখন টিপু ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ দলকে বিব্রত করছে।
নারায়ণগঞ্জবাসীর একাংশের মতে, সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত নেতাদের কারণে বিএনপির দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও আন্দোলনের অর্জন হুমকির মুখে পড়ছে। দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে জেলায় দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্বই সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।