হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানোর দাবিতে রংপুর-কুড়িগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে রংপুর নগরীর নব্বীগঞ্জ এলাকায় অপুর মুন্সী হিমাগারের সামনে মহাসড়কে আলু ফেলে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে রংপুর ও আশপাশের এলাকার শতাধিক আলু চাষি ও ব্যবসায়ী অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে আলুর ন্যায্য দাম না পাওয়ায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মধ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে রংপুরের হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কেজিপ্রতি সাড়ে ৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সমন্বয়ে আলু সংরক্ষণের ভাড়া এর চেয়ে কম রাখা হয়েছে। ফলে রংপুরে তুলনামূলক বেশি ভাড়া নেওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান আরও বাড়ছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীরা জানান, হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবিতে তারা এর আগে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন। কিন্তু এখনো কার্যকর সমাধান না হওয়ায় তারা সড়কে নামতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেন। তাদের দাবি, আলু সংরক্ষণের ভাড়া কেজিপ্রতি ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করতে হবে।
আন্দোলনকারীরা আরও জানান, তাদের দাবি আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। কর্মসূচিতে রংপুর জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী হিমাগার ভাড়া কমানো আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক তৌহিদুল ইসলাম, সদস্য রাসেল, নুরু মিয়াসহ সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
আগেও হয়েছে সড়ক অবরোধ এর আগে চলতি বছরের ১৭ জুনও হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবিতে রংপুরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা। ওই কর্মসূচিতে প্রায় পাঁচ শতাধিক চাষি ও ব্যবসায়ী অংশ নেন। প্রায় এক ঘণ্টার অবরোধে রংপুর বিভাগের সাত জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। পরে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
ওই সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ৬০ কেজির এক বস্তা আলু সংরক্ষণে ৪৩০ টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, যা কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা। তাদের হিসাবে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় মিলিয়ে আলুর খরচ কেজিপ্রতি ২৪ টাকার বেশি হলেও বাজারে তা ১৬ থেকে ১৭ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। ফলে কৃষকরা বড় ধরনের লোকসানে পড়ছেন বলে তারা দাবি করেন।
তবে হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে কৃষক-ব্যবসায়ীদের অভিযোগের সঙ্গে ভিন্নমত রয়েছে। বাংলাদেশ হিমাগার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী এর আগে দাবি করেছিলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় কেজিপ্রতি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা হারে ভাড়া নির্ধারণ করেছে এবং তারা ৬ টাকা ৩২ পয়সা হিসেবে ভাড়া নিচ্ছেন। বিদ্যুতের দাম ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভাড়া সমন্বয়ের দাবি করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
হিমাগার ভাড়া নিয়ে রংপুরে কয়েক মাস ধরেই চাষি-ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের মধ্যে বিরোধ চলছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি সুপারিশ কমিটি রংপুরের ছয়টি হিমাগার সরেজমিন পরিদর্শন করে পরিচালন ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করে। ওই কমিটির প্রতিবেদনে আলু সংরক্ষণে কেজিপ্রতি ব্যয় সর্বোচ্চ ৩ টাকা ৯৭ পয়সা এবং সর্বনিম্ন ২ টাকা ৯৮ পয়সা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হিমাগার মালিকরা জমির মূল্য, স্থাপনা নির্মাণ ব্যয়, ব্যাংকঋণ ও সুদের হিসাবসহ আরও কিছু বিষয় ব্যয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। ফলে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর জানিয়েছে, সব জেলার প্রতিবেদন পাওয়ার পর অধিদপ্তর ও কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়টি বিবেচনা করে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করবে।
এদিকে বৃহস্পতিবারের অবরোধের কারণে রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কে সাময়িকভাবে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। আন্দোলনকারীদের দাবি, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে হিমাগার ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় তারা আরও কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।