সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর বাজারে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখা থেকে গ্রাহকদের কোটি টাকা আত্মসাতের এক লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। দিনমজুরের ঘাম ঝরানো আয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের লাখ লাখ টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়ার খবরে নরসিংপুর বাজার ও এর আশেপাশের এলাকায় চরম উত্তেজনা ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযুক্ত এজেন্ট শাখার মাস্টার ও তার সহযোগীরা গা ঢাকা দেওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শত শত ভুক্তভোগী গ্রাহক।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত কয়েকদিন ধরে নরসিংপুর বাজারের এশিয়া সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার সামনে ভিড় জমাচ্ছেন শত শত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশের একটি স্বনামধন্য ও শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস রেখেই তারা তাদের জীবনের সঞ্চয় এই শাখায় রেখেছিলেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস যে এভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি।
হিসাব নিকাশ করতে গিয়ে যখন গ্রাহকরা দেখতে পান তাদের একাউন্টের ব্যালেন্স শূন্য বা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে, তখন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। শত শত ক্ষুব্ধ মানুষ ব্যাংক শাখাটি ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও বিষয়টি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা এবং বিভিন্ন লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হচ্ছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, এই জালিয়াতি অত্যন্ত সুকৌশলে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছিল চক্রটি। নিরক্ষর ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে কম অভিজ্ঞ সাধারণ গ্রাহকদের সরলতার সুযোগ নিতো তারা।
ভুক্তভোগী মো. জামাল আহমদ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, হঠাৎ করেই আমার মোবাইল ফোনে মেসেজ আসে আমার অ্যাকাউন্ট থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আমি দ্রুত ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি জানালে তারা বিভিন্ন তালবাহানা ও উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে আমাকে ফেরত পাঠায়। অথচ শেষ পর্যন্ত টের পেলাম আমার টাকা পুরোপুরি গায়েব।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, “আমার প্রায় ৬ লাখ টাকা তারা হাতিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে টাকা চাইলে কালক্ষেপণ করেছে এবং আজ দিচ্ছে কাল দিচ্ছে বলে ঘুরাচ্ছিল। এখন তো দেখি তাদের পাত্তাই নেই, সবাই পালিয়ে গেছে।অন্যান্য ভুক্তভোগীরা আরও ভয়ংকর তথ্য জানিয়ে বলেন, আমরা তো ব্যাংকের টেকনিক্যাল বিষয় অত কিছু বুঝতাম না। টাকা তুলতে গেলে ব্যাংককর্মীরা কৌশলে আমাদের হাত থেকে মোবাইল ফোনটি নিয়ে নিতো এবং আমাদের দিয়ে দুইবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা হাতের ছাপ দেওয়াতো। আমাদের মোবাইলে টাকা কাটার কোনো এসএমএস এলে তারা তা মুহূর্তেই ডিলিট করে ফেলতো, যাতে আমরা ঘুণাক্ষরেও টের না পাই।
এই পুরো জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট মাস্টার রুহুল আমীন এবং হোসাইন আহমদ, আরও কয়েকজন ঘটনার পর থেকে লাপাত্তা রয়েছেন। তারাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। নরসিংপুর বাজারের ওই শাখায় গিয়েও তাদেরকে কোনো সহযোগীকে পাওয়া যায়নি। ব্যাংক শাখাটির প্রধান দরজায় কিছু সময় তালা ঝুলছে আবার খুলছে, যা গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন। ঘটনার সত্যতা যাচাই ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসলামী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরজমিনে নরসিংপুর বাজার পরিদর্শন করেছেন।ইসলামী ব্যাংকের ছাতক শাখার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আমাদের একটি বিশেষ টিম ইতোমধ্যে কয়েকবার ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।ব্যাংকের অন্য এক কর্মকর্তা আশ্বস্ত করে বলেন, গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাগ্রে দেখা হচ্ছে। জালিয়াতির প্রমাণ মিললে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দোয়ারাবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানিয়েছেন, আমরা ঘটনাটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত রয়েছি এবং পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ বা এজাহার দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলেই আমরা দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেব।
এ ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অভিনব জালিয়াতির আসল রহস্য উদ্ঘাটন, পলাতক রুহুল আমীন ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি গ্রাহকের কষ্টের জমানো আমানত ফেরত দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।