নারায়ণগঞ্জের বন্দরে গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ একই পরিবারের তিন সদস্যই মারা গেছেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রথমে মারা যায় পরিবারের একমাত্র সন্তান আট বছর বয়সী মারুফ। এরপর মারা যান তার মা বিউটি আক্তার (২৪)। সর্বশেষ মঙ্গলবার ভোরে মারা গেলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা মাইদুল ইসলাম (২৮)। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) ভোরে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাইদুল ইসলামের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান।এর আগে সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল পৌনে ৭টার দিকে একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাইদুলের স্ত্রী বিউটি আক্তার। আর গত শনিবার দুপুরে চিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তাঁদের একমাত্র সন্তান মারুফ।
পরপর তিন দিনের ব্যবধানে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যে পরিবারটি কয়েকদিন আগেও স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবন কাটাচ্ছিল, একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ সেই পরিবারের সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জে এসে সংসার গড়েছিলেন মাইদুল ।মাইদুল ইসলাম ছিলেন রাজমিস্ত্রি। কাজের সন্ধানে নাটোর থেকে নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন তিনি। স্ত্রী বিউটি আক্তার ও একমাত্র সন্তান মারুফকে নিয়ে বন্দরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কুড়িপাড়া চাপাতলী এলাকায় সালাউদ্দিনের একটি টিনশেডের ভাড়া বাড়িতে বসবাস করতেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে ওই বাসায় পরিবার নিয়ে থাকছিলেন মাইদুল। রাজমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় করতেন, তা দিয়েই স্ত্রী-সন্তানের সংসার চালাতেন। স্বল্প আয়ের হলেও পরিবারের তিন সদস্যকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন তিনি।কেউ তখন ভাবেনি, এই ভাড়া বাসাটিই একদিন তাঁদের জীবনের শেষ ঠিকানা হয়ে দাঁড়াবে। সেই ভয়াবহ ভোর গত শুক্রবার ভোরে হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে কুড়িপাড়া চাপাতলী এলাকার ওই টিনশেডের বাড়ি। বিস্ফোরণের পর ঘরের ভেতর থেকে মাইদুল, তাঁর স্ত্রী বিউটি ও ছেলে মারুফকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়রা দ্রুত তাঁদের হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।তিনজনকেই বাঁচানোর চেষ্টা করেন চিকিৎসকরা। স্বজনরাও আশা করেছিলেন, হয়তো চিকিৎসার পর আবার তিনজন একসঙ্গে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি।প্রথমে চলে যায় ছোট্ট মারুফ। সন্তানকে হারিয়ে মায়েরও বিদায়আট বছরের মারুফ ছিল মাইদুল ও বিউটির একমাত্র সন্তান। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হওয়ায় তাকে ঘিরেই ছিল তাঁদের অনেক স্বপ্ন। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার দুপুরে মারা যায় মারুফ। সন্তানের মৃত্যুর খবর পরিবারের জন্য ছিল আরেকটি বড় আঘাত।
সেই শোক সামলানোর আগেই সোমবার সকালে মারা যান মারুফের মা বিউটি আক্তার।একদিকে সন্তানকে হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে নিজের শরীরের যন্ত্রণা—সবকিছুর মধ্যেই চিকিৎসাধীন ছিলেন বিউটি। শেষ পর্যন্ত তিনিও আর বাঁচতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত চলে গেলেন মাইদুলও স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পর পরিবারের শেষ সদস্য হিসেবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন মাইদুল ইসলাম। তিনিও ছিলেন গুরুতর দগ্ধ।মঙ্গলবার ভোরে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। মাইদুলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ওই পরিবারের তিন সদস্যেরই মৃত্যু হলো। কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি পরিবারের বাবা, মা ও একমাত্র সন্তান—তিনজনই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।
গ্যাস জমে বিস্ফোরণের প্রাথমিক ধারণা ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, গ্যাসের লাইনে লিকেজ থেকে ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। ঘরের জানালা বন্ধ থাকায় গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ না পেয়ে ভেতরে জমে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ভোরে মাইদুল ইসলাম সিগারেট ধরানোর সময় আগুনের সংস্পর্শে জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলেও প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত প্রয়োজন। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এবং এর পেছনে কারও অবহেলা ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।
এখন আর কেউ নেই সেই সংসারে মাইদুলের পরিবারটি ছিল ছোট। স্বামী, স্ত্রী আর এক সন্তান—এই তিনজনকে নিয়েই ছিল তাঁদের সংসার। জীবনের প্রয়োজনেই নাটোর ছেড়ে নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন মাইদুল। কাজ করতেন, সংসার চালাতেন, ছেলেকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেন।কিন্তু কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই সংসারে আর কেউ রইল না। মাইদুল নেই। বিউটি নেই।মারুফও নেই।যে ঘরে তাঁদের কথা, হাসি আর ছোট ছোট সংসারের ব্যস্ততা ছিল, এখন সেখানে পড়ে আছে শুধু স্মৃতি।
নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন এই দুর্ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে বাসাবাড়িতে গ্যাসলাইন ও গ্যাস সংযোগের নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষ করে পুরোনো বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গ্যাসলাইনের লিকেজ নিয়মিত পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, লিকেজ দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। গ্যাসের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় সামান্য অসতর্কতাও যে বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে, বন্দরের এই ঘটনা তারই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ।তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তিনটি মৃত্যু, একটি পরিবারের শেষএকটি পরিবার শেষ হয়ে যাওয়ার গল্প সাধারণ কোনো দুর্ঘটনার খবর নয়। মাইদুলের পরিবারও হয়তো অন্য অনেক পরিবারের মতোই ছিল। মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব, সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের প্রয়োজন—এসব নিয়েই চলছিল তাঁদের জীবন।
হয়তো মাইদুল কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে ছোট্ট মারুফ বাবার কাছে ছুটে আসত। হয়তো বিউটি স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতেন। হয়তো তাঁদেরও ছিল আরও ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন।কিন্তু সেই স্বপ্নের আর কোনো আগামীকাল নেই।একটি বিস্ফোরণ কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিয়েছে তাঁদের সবকিছু। হাসপাতালে শুরু হওয়া বাঁচার লড়াইও শেষ পর্যন্ত তাঁদের ফিরিয়ে দিতে পারেনি স্বাভাবিক জীবনে।প্রথমে সন্তান, এরপর মা, সবশেষে বাবা—একটি পরিবারের তিনটি প্রাণই চলে গেল একে একে।নারায়ণগঞ্জে কাজের সন্ধানে এসে যে পরিবারটি নতুন করে জীবন শুরু করেছিল, কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই পরিবারের আর কেউ জীবিত রইল না। এখন মাইদুল, বিউটি ও ছোট্ট মারুফ—তিনজনই তাঁদের স্বজনদের কাছে শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবেন।