সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলং চা বাগানের একাংশ এখন ধ্বংসের পথে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পানি সংকটে প্রায় ১০ থেকে ১২ একর জমির চা গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। অথচ বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো জরুরি পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। উল্টো দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার বক্তব্যে প্রকট হয়েছে অনীহা ও উদাসীনতা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। সিলেট অঞ্চলকে বলা হয় এ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সেই সিলেটের জাফলং চা বাগানের একাংশ এখন পানিশূন্যতায় মৃত্যুপথযাত্রী। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে এই বাগানের নির্দিষ্ট একটি অংশে সেচের অভাবে চা গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে যাচ্ছে এবং গাছ মারা যেতে শুরু করেছে।
শুধু চা শিল্পই নয়, এই বাগানের সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গোয়াইনঘাটের পর্যটন খাতও। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক জাফলং চা বাগানের সবুজের সমারোহ দেখতে ছুটে আসেন। চা বাগানের এই মনোরম দৃশ্য স্থানীয় পর্যটন শিল্পের একটি বড় আকর্ষণ। কিন্তু পানি সংকটে চা গাছ মরে গেলে সেই সবুজ হারিয়ে যাবে, যা পর্যটকদের আগমন কমিয়ে দেবে। ফলে স্থানীয় হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও পর্যটক পরিবহনের সাথে জড়িত বহু মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।
বিষয়টি নিয়ে বাগান কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলে তাদের পক্ষ থেকে মিলেছে নিষ্ক্রিয়তার সুর। জাফলং চা বাগানের ব্যবস্থাপকের (ম্যানেজার) সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গাছগুলো মারা যাওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে আছে এবং তারা ‘সেটা নিয়ে ভাবছেন’। কিন্তু পানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক কোনো উদ্যোগ বা সেচ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তিনি স্বীকার করেননি। তার এই বক্তব্যে বাগানের দায়িত্বশীল পর্যায়ে প্রয়োজনীয় তৎপরতার অভাবই ফুটে উঠেছে।
অন্যদিকে, পানির অভাবে চা গাছ মরে যাওয়ার পাশাপাশি আরেকটি বড় সংকট দেখা দিয়েছে জাফলং চা বাগানে। বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীসংশ্লিষ্ট এলাকায় বালু ও পাথর উত্তোলনকারীদের কারণে ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বালুখেকুড়া ও পাথর খেকুড়া নামে পরিচিত একটি চক্র নিয়মিতভাবে নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলন করে চলেছে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী জাফলং চা বাগানের বিপুল পরিমাণ জমি ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিনিয়ত এই চক্রের তৎপরতায় বাগানের উর্বর জমি নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে, যা চা বাগানের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবৈধ উত্তোলনের ফলে শুধু পরিবেশেরই ক্ষতি হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মূল্যবান এই সম্পদ ধ্বংসের পথে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক স্থানীয় সচেতন নাগরিক বলেন, “এটা শুধু বাগানের সম্পদ না, এটা রাষ্ট্রীয় সম্পদ। চা আমাদের দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। পানির অভাবে যখন ১০-১২ একর চা গাছ মরে যাচ্ছে, তখন কর্তৃপক্ষের ‘ভাবছি’ বলা কোনো সমাধান হতে পারে না। তাদের এখনই সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি নিজে গিয়ে গাছগুলোর এই মৃতপ্রায় অবস্থা দেখেছি। যদি এখনই পানি না দেওয়া হয়, তাহলে পুরো অংশটুকু শেষ হয়ে যাবে। আর এই বাগানের সৌন্দর্য হারিয়ে গেলে পর্যটকরাও আসবেন না। তখন এলাকার পর্যটন খাতের ব্যাপক ক্ষতি হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অন্যদিকে বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়া নদী এলাকায় বালু ও পাথর তুলে নেওয়ার কারণে প্রতিনিয়ত জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এই বালুখেকুড়া ও পাথর খেকুড়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে জাফলং চা বাগানের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি এই বিষয়ে। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।”
বাগানের এই দুরবস্থা শুধু একটি ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা নয়, বরং দেশের চা শিল্প ও স্থানীয় পর্যটন খাতের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার বিষয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা চাষের জন্য পর্যাপ্ত পানি ও সঠিক পরিচর্যা অপরিহার্য। কিন্তু জাফলং চা বাগানের এই অংশে তার কোনো চিহ্নই নেই।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে বাংলাদেশ চা বোর্ডের স্থানীয় কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বাগান কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও টেকসই সেচ ব্যবস্থা চালু না করলে আগামী দিনে এই বাগানের আরও বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জাফলং চা বাগানের এই করুণ অবস্থা যেন উদাসীনতা আর অনীহার একটি জীবন্ত দলিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রতি এমন গাফিলতি দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ খাতের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের অভাবে একসময় হয়তো এই বাগানের নামের সঙ্গেই মিলিয়ে যাবে চায়ের সবুজের ইতিহাস, আর হারিয়ে যাবে পর্যটকদের প্রিয় একটি গন্তব্য।