হারিয়ে যাওয়া সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ অপরাধীদের হাতে চলে গেলে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব অস্ত্রের অপব্যবহারে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কায় উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। র্যাবের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে সহায়তার জন্য হারানো সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদের সঠিক তথ্যদাতাকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় চট্টগ্রামে র্যাব-৭-এর কার্যালয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান। সরকারি হারানো অস্ত্র উদ্ধারে আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এ সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় শুরুতেই বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা, পরিচিতি ও কুশল বিনিময় করেন র্যাব-৭ অধিনায়ক। পরে র্যাব-৭-এর বিভিন্ন আভিযানিক সাফল্য তুলে ধরেন তিনি।অধিনায়ক বলেন, সরকারি অস্ত্র কোনো সাধারণ বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের সম্পদ এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এসব অস্ত্র কোনো অপরাধী, দুষ্কৃতকারী বা স্বার্থান্বেষী মহলের হাতে চলে গেলে তা পুরো সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। অস্ত্র ভুল হাতে থাকলে সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা তীব্র হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, হারানো সরকারি অস্ত্র উদ্ধার শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক দায়িত্ব নয়; এটি সবার নাগরিক দায়িত্ব। দেশের আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে সম্প্রতি দেশব্যাপী বিশেষ সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।র্যাব-৭ অধিনায়ক জানান, র্যাবের নেতৃত্বে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে সরকারি হারানো অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। এ অভিযান সফল করতে সঠিক তথ্য প্রদানকারীদের জন্য সরকারি আর্থিক পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
পুরস্কারের বিষয়ে তিনি জানান, রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি ও স্নাইপারের সঠিক তথ্য দিয়ে উদ্ধারে সহযোগিতা করলে ২ লাখ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে। শটগান, পিস্তল ও গ্যাসগানের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার সেলের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং সব ধরনের গোলাবারুদের ক্ষেত্রে প্রতি রাউন্ডে ৫০ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে।
র্যাবের বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হারানো সরকারি অস্ত্র ও গোলাবারুদ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া যাবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বেচ্ছায় সঠিক তথ্য দিয়ে অস্ত্র বা গোলাবারুদ উদ্ধারে সহযোগিতা করলে তথ্যদাতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে র্যাব-৭ অধিনায়ক বলেন, আশপাশে কোনো অবৈধ বা হারানো সরকারি অস্ত্রের সন্ধান পেলে তাৎক্ষণিকভাবে নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। একটি সঠিক তথ্য বড় ধরনের অপরাধ রুখে দেওয়ার পাশাপাশি কোনো নিরপরাধ মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
তিনি বলেন, একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। হারানো অস্ত্র উদ্ধারে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ জনগণের ত্রিমুখী সমন্বয় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমের ভূমিকারও প্রশংসা করেন র্যাব-৭ অধিনায়ক। তিনি বলেন, জাতীয় সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে সাংবাদিকরা সবসময় ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে আসছেন। হারানো সরকারি অস্ত্র উদ্ধারের বিশেষ অভিযানেও সাংবাদিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর হতে পারে।
সাংবাদিকরা প্রতিবেদন, টকশো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টের মাধ্যমে র্যাব ও যৌথ বাহিনীর বিশেষ পুরস্কার এবং তথ্যদাতাদের সুরক্ষার বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে পেশাদার ও সাহসী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে হারানো অস্ত্র কোথায় হাতবদল হচ্ছে, কোথায় লুকিয়ে রাখা হচ্ছে কিংবা এর পেছনে কারা রয়েছে—সেসব তথ্যও সামনে আনা সম্ভব বলে জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে র্যাব-৭ অধিনায়ক বলেন, কলম ও ক্যামেরার শক্তি অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। সাংবাদিক সমাজ পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে জননিরাপত্তামূলক এ অভিযানে শামিল হলে দ্রুত হারানো অস্ত্র উদ্ধার করে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।র্যাব-৭-এর পক্ষ থেকে সহকারী পুলিশ সুপার ও সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ. আর. এম. মোজাফ্ফর হোসেন এ তথ্য জানান।