মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা থেকে সর্বহারা পার্টির পরিচয়ে অপহৃত মোঃ আলতাব হোসেন মোল্লাকে পাবনার কাজিরহাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। গত ১০ই সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে তাকে নিজ বাড়ি থেকে অপহরণ করা হয় এবং ১১ই সেপ্টেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রশাসনের তৎপরতা এবং স্থানীয় ও পরিবারের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবির পর মাত্র ৭০ হাজার টাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া এবং অপহরণের প্রকৃত কারণ নিয়ে জনমনে ব্যাপক ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, ভুক্তভোগী আলতাব হোসেন মোল্লা (গ্রাম: কনিআনা চর, তেওতা, শিবালয়) গত ১০ই সেপ্টেম্বর রাতে নিজ বাড়িতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অবস্থান করছিলেন। রাত আনুমানিক ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে ১৪-১৫ জনের একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত ঘরের জানালার ভেতর দিয়ে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে তাকে দরজা খুলতে বাধ্য করে। দুর্বৃত্তদের সকলের মুখে মাস্ক থাকায় কাউকে চেনা সম্ভব হয়নি। ঘরে ঢুকেই তারা প্রথমে ৫ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে আলতাব হোসেনকে জোরপূর্বক বাড়ি থেকে বের করে চোখ বেঁধে একটি নৌকায় তুলে নেয় এবং তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করে।
পথিমধ্যে চলন্ত নৌকার পাশে অন্য একটি নৌকা ভিড়লে কয়েকজন দুর্বৃত্ত নেমে আরিচার দিকে চলে যায়। এরপর মূল দলটি ভুক্তভোগীকে রাজবাড়ী জেলার একটি চরের কলার বাগানে নিয়ে যায়।
চরে নেওয়ার পর ভুক্তভোগীর ফোন দিয়েই তার বাবা ও ছেলের কাছে ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। পরদিন সকাল ১০টার মধ্যে টাকা না দিলে তাকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। সকালে কয়েকবার টাকার জন্য চাপ দিয়ে তাকে শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। নিরুপায় হয়ে তার ছেলে বিকাশের মাধ্যমে জিম্মিকৃত নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠান।
পরবর্তীতে শিবালয় ও রাজবাড়ী থানা পুলিশের সহযোগিতায় এবং ভুক্তভোগীর খালাতো ভাই ও স্থানীয় পরিচিতদের মাধ্যমে সর্বহারা পার্টির নাম ব্যবহারকারী ওই চক্রের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তারা আরও ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে (মোট ৭০ হাজার টাকা) আলতাব হোসেনকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১১ই সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে পাবনার কাজিরহাট এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে দাবীকৃত মুক্তিপণ ১০ লক্ষ টাকার স্থলে মাত্র ৭০ হাজার টাকায় কেন তাকে ছেড়ে দেওয়া হলো এবং দীর্ঘ নৌপথে আসলে কী ঘটেছিল—তা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্ধারের পর ভুক্তভোগী আলতাব হোসেন জানান, তার সাথে কারও কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই, তাই কী কারণে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল তা তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।
তবে তার স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অভিযোগ, কয়েকদিন ধরে তেওতা এলাকায় একটি জোরালো মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ভুক্তভোগীর মামা, ভাই ও ছেলে। এর জেরে বেশ কয়েকজন মাদক কারবারি ও অপরাধী তাদেরকে প্রকাশ্যে গুম, হত্যা এবং ‘সর্বহারার কাছে ধরিয়ে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছিল। মাদকবিরোধী ওই অভিযানের সাথে অপহরণের এই ঘটনার কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি বলে দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্ত সাপেক্ষে এই অপহরণের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যেই এ ঘটনায় শিবালয় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে ২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাকি ১৩/১৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।