রংপুর সিটি করপোরেশনের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ময়নাকুটি ও ওয়ার্ডের শেষ সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘মেসার্স তাওহীদ ট্রেডার্স’ ওএমএস ডিলারের কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ পাওয়া, স্টক রেজিস্টারের হিসাবের সঙ্গে মজুদের গরমিল এবং ভোক্তার নাম রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ না করেই খাদ্যশস্য বিতরণের তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে ওএমএস বিক্রয়কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। ওই সময় বিক্রয়কেন্দ্রে ১৬ বস্তা চাল ও ১৩ বস্তা আটা মজুদ ছিল। পরে স্টক রেজিস্টার পর্যালোচনা করে রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ হিসাবের সঙ্গে বাস্তব মজুদের গরমিল পাওয়া যায়।
এদিকে ডিলার তাসলিমা আক্তারের নামে থাকা ওএমএস ডিলারশিপ, ফুড গ্রেইন লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন মাসে শেষ হয়েছে বলে সরেজমিনে এসব লাইসেন্সের কপি পর্যালোচনায় দেখা যায়। এরপরও তাঁর নামে সরকারি বরাদ্দের চাল-আটা সরবরাহ হয়ে থাকলে, তা কীভাবে সম্ভব হয়েছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভোক্তার তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ না করেই খাদ্যশস্য বিতরণের বিষয়টি জানতে চাইলে ডিলার তাসলিমা আক্তার বলেন, কয়েকজনকে চাল ও আটা দেওয়া হলেও তাঁদের নাম রেজিস্টারে তোলা হয়নি। ওএমএসের নিয়ম অনুযায়ী ভোক্তার নাম রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ এবং টিপসই নেওয়ার পর খাদ্যশস্য বিতরণের কথা জানানো হলে তিনি বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর হবে না বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বরাদ্দ চাল ও আটা খুচরা বিক্রেতা ও হোটেল ব্যবসায়ীদের কাছে বস্তায় বস্তায় বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত ভোক্তারা ওএমএসের পণ্য না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তাসলিমা আক্তার আর কোনো বক্তব্য দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ক্যামেরা চালু করতে বাধা দেন। পরে তিনি তাঁর স্বামীকে ফোনে যুক্ত করেন। তাঁর স্বামী বিষয়টি এবারের মতো ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করে বলেন, নারী হিসেবে তাসলিমার পক্ষে ব্যবসার সব দিক সামাল দেওয়া কঠিন।
তাসলিমার নামে লাইসেন্স কেন করা হয়েছে জানতে চাইলে তাঁর স্বামী জানান, নিজের নামে লাইসেন্স করার সিদ্ধান্ত তাসলিমারই ছিল। সবকিছু ঠিক আছে দাবি করে তিনি বিষয়টি আর না বাড়ানোর অনুরোধ জানান। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘কিছু একটা করে দিচ্ছি, আপনারা নিউজ করবেন না।’
খাদ্য নিয়ন্ত্রক যা বললেন সরেজমিনে পাওয়া তথ্য ও অভিযোগের বিষয়ে রংপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সালেহ আজিজের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স থাকলে কোনো ডিলারের বরাদ্দকৃত চাল-আটা পাওয়ার কথা নয়। তবে কোনো লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলে তা নবায়ন বা কার্যকর করার জন্য ১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সাধারণত ট্রেড লাইসেন্সের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ওএমএস, ফুড গ্রেইন ও ট্রেড লাইসেন্স—তিনটিরই মেয়াদ শেষ হয়ে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ রাখার বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগে কোনোভাবেই বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করার সুযোগ নেই। শুধু বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য শেষ হয়ে গেলে বিক্রয় কার্যক্রম বন্ধ করা যেতে পারে।
রেজিস্টার সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, রেজিস্টারে ভোক্তার তথ্য যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ না করে খাদ্যশস্য বিতরণের কোনো সুযোগ নেই। ওএমএসের খাদ্যশস্য শুধুমাত্র সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে নির্ধারিত নিয়মে বিতরণের কথা। কোনো খুচরা দোকানদার, হোটেল ব্যবসায়ী বা এ ধরনের ব্যক্তির কাছে বস্তা হিসেবে বিক্রির কোনো নির্দেশনা নেই।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে এ ধরনের অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিলারশিপ বাতিল করা হবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা এবং লাইসেন্সের মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় বরাদ্দ পাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।