মানুষ আসলে সারাজীবন একজন মানুষই খোঁজে-
যার কাছে নিজের সমস্ত অভিমান, ভয়, দুর্বলতা আর না-বলা কথাগুলো নির্ভয়ে রেখে দেওয়া যায়।
অথচ আশ্চর্য এই জীবন যে মানুষটি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করে, কখনো কখনো সেই মানুষটিই ভালোবাসা কাছে এলে ভয় পেয়ে যায়।
হয়তো অতীত তাকে শিখিয়েছে-সব মায়া আশ্রয় নয়,সব কাছাকাছি থাকা আপন নয়, আর সব ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত নিরাপদও নয়।
তবুও মানুষ ভালোবাসা চায়।কারণ ভালোবাসাহীন হৃদয় বেঁচে থাকতে পারে ঠিকই,কিন্তু পূর্ণ হয়ে বাঁচতে পারে কি?মানুষ জন্মের শুরু থেকেই আজন্ম ভালোবাসার কাঙাল।
পৃথিবীতে আসার পর থেকেই তার ভেতরে জন্ম নেয় আপন হয়ে ওঠার, কারও কাছে নিজেকে নিরাপদ করে রাখার, কারও মায়ায় একটু নিশ্চিন্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
অন্যের ভালোবাসা পাওয়ার বাসনা মানুষকে কখনো বিভোর করে রাখে, কখনো অপেক্ষায় রাখে, আবার কখনো নিঃশব্দে ভেঙেও দেয়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই অভাববোধটুকু বোধহয় পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষের জীবনেই কোনো না কোনোভাবে উপস্থিত।
ধনী-গরিব, সুস্থ-অসুস্থ, বাক্শক্তিসম্পন্ন কিংবা নির্বাক, দৃষ্টিসম্পন্ন কিংবা দৃষ্টিহীন, কেউই ভালোবাসাবিহীন জীবন চায় না।কারণ ভালোবাসা মানুষের বিলাসিতা নয়, এটি তার অন্তর্গত এক গভীর প্রয়োজন।মানুষ যতই নিজেকে শক্ত, স্বয়ংসম্পূর্ণ কিংবা নির্লিপ্ত বলে প্রকাশ করুক, হৃদয়ের কোনো এক গোপন কুঠুরিতে সে একজন আপন মানুষের অপেক্ষা করেই থাকে।
‘ভালোবাসা’-এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যেই মহান আল্লাহ তাঁর অপার রহস্যের কতটুকুই না লুকিয়ে রেখেছেন! আর মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সেই রহস্যের প্রতি আকর্ষিত করে।তাই হয়তো মানুষ সারাজীবন মানুষ খোঁজে, সম্পর্ক খোঁজে, মায়া খোঁজে, এমনকি কখনো কখনো নিজের অজান্তেই এমন কাউকে খোঁজে-যার কাছে নিজের সমস্ত অপ্রকাশিত কথাগুলো রেখে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
কিন্তু একজন মানুষের ভেতরের সম্পূর্ণ মানুষটাকে জানা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।আমরা কেবল তার কিছু কথা শুনি, কিছু আচরণ দেখি, কিছু নীরবতা অনুভব করি।
তার হাসির আড়ালে কতটা বিষাদ, তার রাগের নিচে কতটা অভিমান, কিংবা তার দূরত্বের পেছনে কতটা ভয়, এসবের কতটুকুই বা আমরা জানতে পারি?
জীবনের পথে চলতে গিয়ে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, যারা নিজেরাই মানুষের কাছে আসে, আবার নিজেরাই দূরে সরে যাওয়ার কারণ খুঁজে নেয়।
হয়তো তারা কোনো একসময় খুব গভীরভাবে আঘাত পেয়েছিল।হয়তো বিশ্বাস করে ঠকেছিল, ভালোবেসে হারিয়েছিল, আপন ভেবে পর হয়ে গিয়েছিল।
তাই একসময় তারা ভালোবাসা চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পুরোপুরি হারাতে না পারলেও, কাউকে বিশ্বাস করার সাহসটুকু হারিয়ে ফেলে।তারা দুঃখের গান গায়, একাকিত্বের গল্প বলে, মানুষের মায়া পেতে চায়-অথচ কেউ সত্যিই কাছে এলে আবার অদৃশ্য কোনো দেয়াল তুলে তাকে দূরে সরিয়ে দেয়।
তাদের হৃদয় ভালোবাসা চায়, কিন্তু মন ভালোবাসাকে ভয় পায়।
এমন মানুষদের প্রতি সহানুভূতি থাকা প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেক কঠিন মানুষের পেছনে হয়তো কোনো না কোনো অদৃশ্য গল্প থাকে।কিন্তু কারও অমীমাংসিত ক্ষতকে বুঝতে গিয়ে নিজের জীবনকে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলা কোনো ভালোবাসার নাম হতে পারে না।কখনো কখনো অন্যের ভাঙা মনকে জোড়া দিতে গিয়ে আমরা নিজের হৃদয়ের টুকরোগুলোই হারিয়ে ফেলি।
তখন ভালোবাসা আর আশ্রয় থাকে না, তা ধীরে ধীরে আত্মবিসর্জনে পরিণত হয়।তাই কাউকে বোঝার চেষ্টা করি, কিন্তু নিজেকেও ভুলে না গিয়ে।
কাউকে ক্ষমা করি, কিন্তু নিজের শান্তির বিনিময়ে নয়।
কারও অতীতের ক্ষতকে সম্মান করি, কিন্তু সেই ক্ষতের অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলি না।কারণ জীবন শুধু কাউকে ভালোবাসার জন্য নয়; নিজেকেও ভালো রাখার জন্য।
জীবন সুন্দর।ভালোবাসাও সুন্দর।আর মানুষ, মহান আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি।তাই আসুন, আমরা ভালোবাসায় বাঁচি, তবে সেই ভালোবাসাকে পরিশুদ্ধ করি আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে।
অন্যকে বোঝার আগে নিজের হৃদয়কে বোঝার চেষ্টা করি।
মানুষের দুর্বলতার প্রতি সহানুভূতিশীল হই, কিন্তু সম্পর্কের নামে অন্যায়, অবহেলা কিংবা মানসিক অস্থিরতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে না নিই।
হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর রূপ হলো-কাউকে পাওয়া নয়, বরং ভালোবাসার মধ্যেও নিজের আত্মাকে হারিয়ে না ফেলা।
আর শেষ পর্যন্ত, মানুষের হৃদয়ের সব রহস্যের ঊর্ধ্বে যিনি আছেন, তাঁর কাছেই ফিরে যাওয়া।
কারণ মানুষ যতই মানুষের ভালোবাসার কাঙাল হোক, হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি শেষ পর্যন্ত মহান আল্লাহর কাছেই।