বৃষ্টি আইলে ঘরের চাইতে বাইরে বালা। কথাটি বলতে বলতেই চোখ ভিজে ওঠে ৭২ বছর বয়সী আজমত আলীর। কারণ, তাঁর কাছে বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক, দুর্ভোগ আর নির্ঘুম রাত।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের আড়াই আনী ব্রিজপাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন আজমত আলী ও তাঁর স্ত্রী মোছা. আছিয়া খাতুন (৫৬)। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করে বিয়ে দিয়েছেন তারা। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নেই নিজের এক টুকরো জমি, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর।
ব্রিজের পাশে পলিথিন দিয়ে তৈরি একটি ছোট্ট ঝুপড়িই এখন তাদের একমাত্র ঠিকানা। টিনের ছাদ নেই, মজবুত দেয়াল নেই—চারদিকে শুধু ছেঁড়া পলিথিন। সামান্য বৃষ্টি হলেই সেই ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। ভিজে যায় বিছানা, কাপড়-চোপড়, এমনকি খাবারও। তখন ঘরের ভেতরে থাকার চেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাই যেন বেশি স্বস্তির। তাই বুকভরা কষ্ট নিয়ে আজমত আলী বলেন, “বৃষ্টি আইলে ঘরের চাইতে বাইরে বালা।”
এই বয়সেও সংসারের হাল ধরতে প্রতিদিন অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করেন তিনি। কাজ থাকলে হাতে আসে সামান্য কিছু টাকা, যা দিয়ে কোনোমতে চাল-ডাল কিনে দু’মুঠো খাবারের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু যেদিন কাজ থাকে না, সেদিন তাদের চুলাও জ্বলে না। অনাহারেই কেটে যায় দিন।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ স্ত্রী আছিয়া খাতুন। অর্থের অভাবে নিয়মিত ওষুধ কেনা তো দূরের কথা, চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। প্রতিদিন দুবেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। অসুস্থ স্ত্রীকে পলিথিনের ঝুপড়িতে রেখে জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে যান আজমত আলী। দিন শেষে ফিরে এসে দেখেন, বৃষ্টির পানিতে আবারও ভিজে গেছে তাদের একমাত্র আশ্রয়।
স্বাধীনতার এত বছর পরও একটি বৃদ্ধ দম্পতির ভাগ্যে জোটেনি নিরাপদ একটি ঘর। জীবনের শেষ সময়ে এসে তাদের একটাই চাওয়া—একটি শুকনো আশ্রয়, দুবেলা খাবার এবং প্রয়োজনের সময় সামান্য চিকিৎসার ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের মতে, আজমত-আছিয়া দম্পতির মতো অসহায় মানুষের পাশে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মানবিকভাবে এগিয়ে আসা উচিত। একটি ছোট্ট ঘর হয়তো তাদের জীবনের সব কষ্ট দূর করতে পারবে না, কিন্তু অন্তত শেষ বয়সে বৃষ্টির রাতে আর বৃষ্টির পানির সঙ্গে চোখের জল মিশিয়ে কাটাতে হবে না।
সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তি, দানশীল সংগঠন, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি বিনীত অনুরোধ—অসহায় এই বৃদ্ধ দম্পতির পাশে দাঁড়ান। তাদের জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এবং ন্যূনতম খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসুন। আপনার সামান্য সহযোগিতাই তাদের জীবনের শেষ সময়টুকু একটু স্বস্তি ও মর্যাদার সঙ্গে কাটানোর সুযোগ করে দিতে পারে।
আজমত আলীর আর্তনাদ শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের অসংখ্য অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়—মানবতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে এই বৃদ্ধ দম্পতির মুখে হাসি ফোটাতে কে এগিয়ে আসে ।