নতুন জাত উদ্ভাবন,নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ,বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও উটপাখি গবেষণায় বড় অগ্রগতি:ড.মো.সাজেদুল করিম সরকার
বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাতকে বিজ্ঞানভিত্তিক,টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই)পোল্ট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ প্রকল্প’সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।প্রকল্পটির মাধ্যমে উচ্চ উৎপাদনশীল নতুন জাত উদ্ভাবন,আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন,হাজারো খামারিকে প্রশিক্ষণ,নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন এবং বিকল্প বাণিজ্যিক সম্ভাবনা হিসেবে উটপাখি নিয়ে গবেষণাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ও দেশের বিশিষ্ট প্রাণিপুষ্টি বিজ্ঞানী ড.মো.সাজেদুল করিম সরকার,পিএইচডি।
সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এটি শুধু একটি সরকারি প্রকল্পের সমাপ্তি নয়,বরং দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে বিজ্ঞাননির্ভর ও আত্মনির্ভরশীল করার একটি জাতীয় মিশনের সফল বাস্তবায়ন।
তিনি জানান,প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল উন্নত জাত উদ্ভাবন,দেশীয় জিনগত সম্পদ সংরক্ষণ,উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং পোল্ট্রির পুষ্টি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।এসব লক্ষ্য শতভাগ অর্জিত হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে এমন নতুন স্ট্রেইন উদ্ভাবন করা হয়েছে,যা কম খাদ্যে অধিক মাংস ও ডিম উৎপাদনে সক্ষম হবে এবং খামারিদের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
ড. সাজেদুল করিম সরকার জানান,দেশের উত্তরাঞ্চলে গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সৈয়দপুরে বিএলআরআই-এর একটি আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।এর মাধ্যমে প্রান্তিক খামারিরা আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণালব্ধ সেবা আরও সহজে পাচ্ছেন।
খামারিদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১৮টি ব্যাচে চার হাজার ২৫০ জনেরও বেশি খামারি ও নতুন উদ্যোক্তাকে আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা,পুষ্টি এবং বায়োসিকিউরিটি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে।
পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের বিষয়টিও প্রকল্পের অন্যতম সাফল্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।পোল্ট্রির বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন ও জৈবসার তৈরির কার্যকর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদনের পুষ্টিগত ফর্মুলাও তৈরি করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে তিনি আরও জানান,প্রকল্পের আওতায় প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের আবহাওয়ায় উটপাখির অভিযোজন,প্রজনন ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিচালিত হয়েছে।এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক খন্দকার তৌহিদুল ইসলাম সফলভাবে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন,যা প্রকল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন।
ড.সাজেদুল করিম সরকারের মতে,প্রকল্প শেষ হলেও গবেষণার যাত্রা থেমে থাকবে না।প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা আধুনিক অবকাঠামো,গবেষণাগার এবং দক্ষ মানবসম্পদ ভবিষ্যতেও বিএলআরআই-এর নিয়মিত কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।একই সঙ্গে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও জাতগুলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন,”পোল্ট্রি খাতের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বায়োসিকিউরিটি অনুসরণ করে খামার পরিচালনা করলে এই খাত তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,গবেষণানির্ভর এসব উদ্ভাবন দেশের পোল্ট্রি শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক,
নিরাপদ ও টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে।