ভ্যাপসা গরম, তার ওপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং—সব মিলিয়ে চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জনজীবন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র গ্যাস সংকট। বিশেষ করে মানিকগঞ্জের প্রায় সকল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না; সেইসঙ্গে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না একপ্রকার বন্ধই বলা চলে। লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক বাসাবাড়িতেই ঠিকমতো জ্বলছে না চুলা। কেবল সাধারণ মানুষই নয়, এই জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শিল্প উৎপাদন খাতেও। দিনের পর দিন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
হঠাৎ কেন এই ভয়াবহ পরিস্থিতি? জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত প্রাথমিক জ্বালানির অভাব, ডলার সংকট এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়াই এই সংকটের প্রধান কারণ। দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় অংশই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশে উল্লেখ করার মতো নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি। উল্টো পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুত ফুরিয়ে আসায় দেশীয় উৎপাদন এখন অনেকটাই তলানিতে এসে ঠেকেছে।
জানা গেছে, দেশীয় এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস), কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানি করে থাকে। কিন্তু বিপত্তি বেধেছে বর্তমান ডলার সংকট নিয়ে। সময়মতো বকেয়া পরিশোধ করতে না পারায় জ্বালানি আমদানি এখন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত কয়লা, তেল ও গ্যাসের অভাবে দেশের অনেক বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। ফলে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন অনেকটাই কমে গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় চুরি, অবৈধ সংযোগ এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে বিপুল পরিমাণ ‘সিস্টেম লস’ হচ্ছে। মানিকগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম পাওয়ায় বাধ্য হয়েই তাদের এলাকাভিত্তিক দফায় দফায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে দেশীয় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে অবহেলা করায় জ্বালানি খাত এখন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম একটু বাড়লেই দেশের অর্থনীতিতে এর সরাসরি ধাক্কা লাগছে।
তবে এই সংকট রাতারাতি সমাধানযোগ্য না হলেও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সেই সঙ্গে বিদেশি কোম্পানিগুলোর সাথে দ্রুত চুক্তি করে খনন কাজ শুরু করা জরুরি। এছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে জ্বালানি না কিনে বিভিন্ন দেশের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। সেই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রিপেইড মিটারের ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে গ্যাস-বিদ্যুতের অপচয় ঠেকাতে হবে। মানিকগঞ্জসহ সারা দেশের সাধারণ মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংকট নিরসনে সরকার কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।