শিল্পায়নের স্বপ্ন নিয়ে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল রাজশাহী বিসিক শিল্পনগরী-২। অবকাঠামো নির্মাণ ও জমি উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও চার বছর পরও প্রত্যাশিত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়নি প্রকল্পটি। ১৫০ বিঘার বেশি জমিতে ২৮৬টি প্লট তৈরি করা হলেও বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৭৭টি। এর মধ্যে শিল্প উৎপাদন শুরু হয়েছে মাত্র তিনটি প্লটে। ফলে ২০৯টি প্লট এখনও পড়ে আছে খালি। অধিকাংশ প্লটে গজিয়েছে কাশবন ও ঝোপঝাড়। পুরো এলাকাজুড়ে ঘন কাশবন ও জঙ্গল দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একটি শিল্পাঞ্চল। প্রতিবছর টেন্ডারের মাধ্যমে এসব কাশবন বিক্রি করে বিসিক কর্তৃপক্ষ।
রাজশাহী বিসিকের দেওয়া তথ্যমতে, ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কসংলগ্ন ৫০ একর জমিতে গড়ে ওঠা বিসিক-২ প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুলাইয়ে উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তবে উদ্বোধনের চার বছর পরও সেই লক্ষ্য পূরণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
প্রকল্পের ২৮৬টি প্লটের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৭৭টি। অর্থাৎ ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ প্লট এখনও ফাঁকা। বরাদ্দ পাওয়া প্লটগুলোর অধিকাংশেই শিল্প কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা শিল্পনগরীর বড় একটি অংশ কার্যত অনাবাদি অবস্থায় পড়ে রয়েছে।উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, শিল্পনগরীতে এখনও গ্যাস সংযোগ নেই। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। বিদ্যুৎ সংযোগ পেতেও নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। এর সঙ্গে প্লটের দাম আশপাশের বাজারদরের তুলনায় বেশি হওয়ায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
উদ্যোক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সপুরা এলাকায় ৩২৯টি প্লট নিয়ে ১৯৬২ সালে রাজশাহী বিসিক-১ চালু হয়। সেখানে বর্তমানে ২০৪টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি কারখানা রুগ্ন অবস্থায় পড়ে থেকে বন্ধ রয়েছে। পুরোনো শিল্পনগরীতেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই চালু করা হয় বিসিক শিল্পনগরী-২।
দফায় দফায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও প্লট বরাদ্দ দিতে পারছে না বিসিক কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত ১৩ আগস্ট অব্যবহৃত ২০৯টি প্লট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এতে জমির মূল্য এককালীন অথবা সর্বোচ্চ ১৪টি সহজ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।বিসিক-২ শিল্পনগরীতে এ টাইপের ৬ হাজার বর্গফুট, বি টাইপের ৪ হাজার ৫০০ বর্গফুট এবং এস টাইপের ৪ হাজার ৮০০ ও ৭ হাজার ২১০ বর্গফুটের প্লট ফাঁকা রয়েছে। প্রতি বর্গফুট জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৩৬ দশমিক ২৭ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উদ্বোধনের সময় প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বিসিক-২ শিল্পনগরীকে উত্তরাঞ্চলের নতুন শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। উদ্যোক্তাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চার বছর পরও এসব প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিল্পনগরীতে এখনও গ্যাস সংযোগ চালু হয়নি। পানি সরবরাহ পুরোপুরি কার্যকর নয়। ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ হয়নি। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমান কোনো অবকাঠামোও গড়ে ওঠেনি। ফলে উদ্বোধনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির বড় অংশ এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
রাজশাহী মেটাল ফাউন্ড্রির স্বত্বাধিকারী মো. সালাউদ্দীন বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য আবেদন করলে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু গ্যাস কবে আসবে, কেউ বলতে পারছে না। সাবস্টেশন নির্মাণের কথাও অনেক দিন ধরে শুনছেন, কিন্তু এর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।রাজশাহী শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহমেদ জাকী বলেন, শিল্পনগরীটি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়নি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্লটের আকার ও দাম নির্ধারণ করা উচিত ছিল।উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রোজেটি নাজনীন বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্লট রাখা হলেও পর্যাপ্ত পুঁজি ও সহজ ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। নারী উদ্যোক্তারা এখনও সহজে ঋণ পান না।
তবে বিসিকের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক জাফর বায়েজীদ বলেন, দ্রুত অবশিষ্ট প্লট বরাদ্দ দেওয়া হবে। এ জন্য বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধনের মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারাও এখন আবেদন করতে পারবেন। প্লটগুলো বরাদ্দ হয়ে গেলে গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় সব সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।প্লটের দাম বেশি হওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুরুতে দাম বেশি মনে হলেও শিল্প কার্যক্রম শুরু হলে জমির দাম আরও বেড়ে যাবে। বর্তমান দাম স্বাভাবিক।