একটি সরকার নির্বাচিত হতে হলে নানা ধরনের ন্যায্য আন্দোলন সংগ্রাম করতে হয়, রাষ্ট্রের ও জনগণের কল্যাণে কর্মসূচি ঘোষণা দিতে হয় ও মানুষের আস্থা অর্জন করে তারপর ভোটে জয়লাভ করেন | একটি নির্বাচিত সরকারের সাফল্য শুধু উন্নয়ন প্রকল্প, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর নির্ভর করে না; সরকারের ভাবমূর্তি অনেকাংশে নির্ভর করে মাঠপর্যায়ে জনগণ কী ধরনের আচরণ পাচ্ছে তার ওপর। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের আচরণ সাধারণ মানুষের কাছে সরকারের রাজনৈতিক চরিত্রের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়।
এ অবস্থায় সরকারের প্রথম করণীয় হওয়া উচিত দলীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা নিশ্চিত করা। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হলেই যেন প্রশাসন, পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন। অপরাধ করলে তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ধরন বিবেচনা করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তৃণমূল পর্যায়ের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর তা রাজনৈতিকভাবে ধামাচাপা না দিয়ে দ্রুত তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলা, গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া—সবকিছু আইনের স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালিত হওয়া জরুরি।
তৃতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক চাপমুক্তভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একজন জনপ্রতিনিধি, দলীয় নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যেন কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে বেআইনি কাজে বাধ্য করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
চতুর্থত, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু বক্তব্য বা সতর্কবার্তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে অন্যরা একই ধরনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত না হয়।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্য নিয়মিত নৈতিকতা, জনসেবা, রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। জনগণের সেবা করার পরিবর্তে কেউ যদি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত দুই ধরনের ব্যবস্থাই থাকা উচিত।
ষষ্ঠত, সরকারি সেবা ও স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে। সরকারি প্রকল্প, টেন্ডার, বরাদ্দ ও বিভিন্ন সেবায় রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ যত কমবে, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও তত কমবে। ডিজিটাল ব্যবস্থা ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে জনগণের নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের বুঝতে হব কয়েকজন তৃণমূল নেতাকর্মীর অপরাধকে অবহেলা করা কখনোই ছোট বিষয় নয়। কারণ একজন সাধারণ নাগরিক যখন কোনো রাজনৈতিক নেতার হাতে হয়রানির শিকার হন, তখন তার কাছে ওই ব্যক্তির কর্মকাণ্ড এবং সরকারের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি সরকারের বহু বছরের অর্জনও স্থানীয় পর্যায়ের কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সরকারের উচিত তাই দল নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। যে ব্যক্তি অপরাধ করবেন, তিনি যত বড় রাজনৈতিক পরিচয়ের অধিকারীই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ক্ষেত্রেও ন্যায়সংগত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে কারণ আইনের শাসন মানে নিরপেক্ষতা।
রাজনীতি জনগণের সেবা করার মাধ্যম। ক্ষমতা কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয় এবং দলীয় পরিচয় অপরাধের বৈধতা দিতে পারে না। তৃণমূল নেতাকর্মীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকার যদি কঠোর, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়, তাহলে শুধু সরকারের ভাবমূর্তিই রক্ষা হবে না; জনগণের মধ্যে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও শক্তিশালী হবে।
সুতরাং সরকারের এখনই বার্তা দিতে হবে দলীয় পরিচয় অপরাধের ঢাল নয়, ক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার নয় এবং জনগণের সঙ্গে অন্যায় আচরণের কোনো রাজনৈতিক ছাড় নেই। সরকারের সাফল্য রক্ষার স্বার্থেই তৃণমূল পর্যায়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এজন্য একটি মনিটরিং সেল খোলা যেতে পারে | যে কোন লোক নির্ভয়ে যাতে এই সেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে যাতে অভিযোগ জানাতে পারে | দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য রাষ্ট্র সরকার সমাজ পরিবার সকলের সহযোগিতা দরকার |
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ নিউজ এডিটরস গিল্ড