‘হঠাৎ করে কোন প্রকার পূর্ব ঘোষণা ছাড়া জ¦ালানি তেলের মূল্য লিটার প্রতি ২০টাকা বৃদ্ধি সরকারী ঘোষণাকে আত্মঘাতী। কোন প্রকার প্রস্তুতি ছাড়া যখন বিশ^বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যহ্রাস পেয়েছে ঠিক তখন জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া অন্য কিছুই নয়। এতে প্রমানিত হয় সরকারের জøালানি মন্ত্রনালয়ের সাথে বিশ^বাজারের কোন সম্পর্ক নাই বা তারা বিশ^ বাজার সম্পর্কে কোন খোজখবরই রাখেন না। জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ইতোমধ্যে অর্থনীতি ও জনজীবনে মারাত্মক নেতিবাচত প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ফণ্যপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, কৃষিতে সেচ ব্যয় বৃদ্ধি, নিথ্যপণ্যের মূল্য আরো বৃদ্ধিসহ এই সিদ্ধান্ত জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। যাতে মানুষের নাভিশ^াস বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে।
সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায় নাই বরং কমেছে। সাধারণ মানুষ সরাসরি জ¦ালানি তেল না কিনলেও মূল্যবৃদ্ধির ফলে প্রতিদিন তাদের খরচ বৃদ্ধি পাবে। কারণ, জ¦লানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষিতে উৎপাদিত ফসলের খরচ, পরিবহন খরচ, য়াতায়াত খরচ, শিল্পে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। আর এই বাড়তি খরচ সব সাধারণ মানুষের পেকেট থেকেই যাবে। যাদের পর্যাপ্ত টাকা আছে তাদের হয়তো অসুবিধা নাই। কিন্তু, সাধারণ মানুষ, স্বল্প আয়ের মানুষ ও কর্মহীন মানুষের কথা কি একবারও ভেবেছেন সরকার বাহাদুর ?’ আত্মঘাতী এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে আর্থিক খাতসহ অর্থনীীতর অন্যান্য থাকে সমন্বয় করা ও দুর্নীতি-লুটপাট-অপচয় বন্ধ করতে হবে সরকারকে। দেশে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশী। এসময়ে জ¦ালানি তেলের মূল্য আবারো বৃদ্ধি করার ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন। সরকার অল্প কিছুদিন পূর্বেই জ¦ালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করেছে। আবারো জ¦লানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করলো। হয়তো গ্যাসের মূল্যও বৃদ্ধি করবে। এমন অবস্থায় সাধারণ মানুষের টিকে থাকা কঠিন হবে। প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য। দৈনিন্দিন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সর্বস্তরের মানুষ। এরই মধ্যে সরকার জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে জনস্বার্থ বিরোধী অবস্থান গ্রহন করেছে। জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। মূলত: সরকার ছলে বলে কৌশলে সাধারণ মানুষের আয়ের উপর গোপন হামলা চালাচ্ছে। জনগনের পরিশ্রমের অর্থ নানা কায়দায় হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রত্যক্ষ করের পরিবর্তে পরোক্ষ করের বোঝাতো আছেই, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে তেল-বিদ্যুৎ-সিলিন্ডার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। জনগন কি সবকিছু অকাতরে মেনে নেবে? পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে জনগন কি করবে ?
মানুষের আয় বাড়াতো দূরের কথা বরং মানুষের আয় কমছে, অন্যদিকে বেড়ে চলছে জীবনযাত্রার ব্যয়। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির আগুনে পুড়ছে প্রায় প্রতিটি সংসার। কাজের বাজারও মন্দা। নেই নতুন কর্মসংস্থান। নানা সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। এরই মাঝে রোববার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চেপে বসেছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষসহ যাদের হাতে আয় বাড়ানোর ক্ষমতা নেই, তাদের যাপিত জীবন একরকম বিষিয়ে উঠছে। তারা সংসার চালাতে শুধু হিমশিম খাচ্ছেন বললে ভুল বলা হবে; ‘দিশেহারা’ কথাটি যথার্থ। সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় তাদের এখন কেউ ধারও দিতে চায় না। ফলে জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে না, শিল্পপতির শিল্প পরিচালনার উৎপাদন খরচও বাড়বে বহুগুণ। বাড়ছে গণপরিবহণসহ সব ধরনের পরিবহণ ভাড়া। নিত্যপণের বাজার তো এ অজুহাতে সোমবার থেকেই গরম। কৃষকের সেচ খরচও নির্ঘাত বাড়ছে। এই যখন অবস্থা, বাড়ি ভাড়া বাড়াতেও বাড়িওয়ালারা বেশি সময় নেবেন না। এককথায় বলা যায়, ধনী থেকে দরিদ্র-সবার জীবনে কমবেশি এর বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য।
জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি করছে সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম কমানোর নজির নেই। বরং দাম বাড়ার সময় দ্রæত সমন্বয় করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দেশে আসতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে হঠাৎ করে রাতারাতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তও একটি কারণ হতে পারে। আইএমএফের ঋণ পেতে সরকারকে যেসব শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এভাবে শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার একদিকে বিপিসির বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি সামাল দিতে চাচ্ছে, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ভোক্তার ওপর না চাপিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। তবে হঠাৎ করে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে অর্থনীতিতে এর ‘দ্বিতীয় দফার’ প্রভাব, বিশেষ করে পরিবহন, কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দামে দেখা দিতে পারে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির সাথে বাস, ট্রাক, লঞ্চসহ বিভিন্ন পরিবহন ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে উৎপাদক থেকে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে চাল, ডাল, সবজি, মাছ, গোশতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ সৃষ্টি হতে পারে। অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুনও সতর্ক করেছেন যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে : দেশের কৃষি খাত সেচ, জমি প্রস্তুত, ফসল পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচযন্ত্র, ট্রাক্টর ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়বে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারে খাদ্যপণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে। শিল্পে বাড়তি ব্যয় : গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতার মধ্যে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিকল্প হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করে। জ্বালানির দাম বাড়ায় তাদের উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে। বিশেষ করে পোশাক ও অন্যান্য রফতানিমুখী শিল্পে এর প্রভাব পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে যেখানে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে জ্বালানি ব্যয়ের এই বৃদ্ধি উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি : গণপরিবহনের ভাড়া বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নি¤œ ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও দৈনিক যাতায়াতকারী মানুষের মাসিক পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণাই মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ তেলের দাম শুধু পরিবহণ ব্যয়ই বাড়ায় না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ব্যয়-সবখানেই বাড়বে খরচ। সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ বোঝাটিও বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবদ্ধি প্রভাবে পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ার কথা অসাধুর কারসাজি করে বেশি না বাড়াতে পারে সেদিকে তদারকি সংস্থার নজরদারি করতে হবে।
এমনিতেই গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত। দ্রব্যমূল্যে উর্ধগতিতে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে। সরকার এসব সমস্যার কোনো কার্যকর সমাধান করতে পারছে না। সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্র আবারও চাপিয়ে দিল এক চরম জুলুমের বোঝা। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য যখন কমছে তখন দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী ও অযৌক্তিক। এক লাফে লিটার প্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধির ফলে গাড়ি ভাড়া তথা পণ্যপরিবহন ও যাতায়াত খরচ বাড়াবে, বিদ্যুতের দাম বাড়বে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে। ফলে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ-কৃষক, নিন্মবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবেনযাত্রার ব্যয় বহুগুনে বেড়ে গিয়ে দুর্বিসহ করে তুলবে। বর্তমান সরকার পাঁচ মাসে তিনবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালো। এটা সরকারের গণবিরোধী নীতির প্রকাশ।
সাধারণ মানুষের জীবন এমনিতেই উচ্চমূল্যের যাতাকলে পিষ্ট। তার ওপর জ্বালানির আরো মূল্যবৃদ্ধি সইবে কেমনে। ক্ষমতায় গেলে শাসগোষ্টি কেন জানি সাধারণ মানুষের কথা ভাবেনা। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দায়িত্বশীল সরকারকে আগে গণমানুষের কথা ভাবা প্রয়োজন। অবিলম্বে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সাথে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। জনগণের ওপর একের পর এক মূল্যবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে কোনো টেকসই অর্থনৈতিক সমাধান তৈরি করা সম্ভব নয়।
লেখক : রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক