মানুষ জন্ম নেয়।
পৃথিবীর আলো দেখে, ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, শৈশবের নিষ্পাপ দিনগুলো পেরিয়ে কৈশোর আসে আর কৈশোরের হাত ধরেই জন্ম নেয় অনুভূতি, স্বপ্ন, আবেগ আর অজস্র কল্পনা।
কিন্তু সবাই সেই স্বপ্নের শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। কেউ কেউ জীবনের একেবারে শুরুতেই ঝরে যায়। কেউ হারিয়ে যায় সময়ের নির্মম স্রোতে, তবুও জীবন থেমে থাকে না, পৃথিবী তার নিজের নিয়মে ঘুরতেই থাকে।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো, সে কখনোই পুরোপুরি মোহমুক্ত হতে পারে না।
হয়তো এই মোহই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, আগামী দিনের জন্য অপেক্ষা করতে শেখায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
যৌবন আসে।
জীবনের চাহিদা বাড়ে, একটি সুন্দর সংসার, ভালোবাসার মানুষ, নিরাপদ ভবিষ্যৎ, এসব নিয়ে মানুষ স্বপ্ন বুনতে শুরু করে।
কিন্তু সব স্বপ্ন কি বাস্তব হয়? সবাই কি তার কল্পিত জীবনের দেখা পায়?
হয়তো না।
কেউ অর্থের অভাবে, কেউ সম্পর্কের ভাঙনে, কেউ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার কাঙ্ক্ষিত জীবনের দেখা পায় না, তবুও মানুষ হাল ছাড়ে না, কারণ জীবন তো বয়ে চলা নদীর মতো।
নদী যেমন বাধা পেয়ে থেমে যায় না, তেমনি জীবনও থেমে থাকার নাম নয়।
তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে, কিছু ঘটনা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়, এমন ক্ষত দেয়, যার দাগ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে রক্তক্ষরণ চলতেই থাকে। তখন জীবনের রংগুলো যেন ফিকে হয়ে যায়। হাসি থাকে, কিন্তু আনন্দ থাকে না। মানুষ বেঁচে থাকে, কিন্তু তার ভেতরের একটা অংশ নিঃশব্দে মারা যায়।
তারপরও মানুষ বাঁচে।
আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।
উম্মীদ মানুষকে নতুন সকাল দেখার সাহস দেয়। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে-এই বিশ্বাসই মানুষকে প্রতিদিনের সংগ্রামে এগিয়ে নিয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলার সবচেয়ে বড় রহমতগুলোর একটি হলো সন্তান।
সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা শুধু একটি জৈবিক প্রক্রিয়া নয়, এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব, ত্যাগ এবং অস্তিত্বের এক গভীর অর্থ বহন করে। হয়তো এভাবেই আল্লাহ পৃথিবীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থা করেছেন।
মানুষ ছোটবেলা থেকে সুখের খোঁজে ছুটে চলে।
কখনো ভাবে ভালো ফলাফল পেলেই সুখ, কখনো ভাবে চাকরি পেলেই সুখ, কখনো ভাবে বিয়ে করলেই সুখ, আবার কখনো ভাবে অর্থ-সম্পদ জমলেই সুখ।
কিন্তু প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের পরও মনে হয়, কিছু একটা যেন বাকি রয়ে গেছে।
অবশেষে যখন সন্তান আসে, তখন মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে গভীর ভালোবাসার স্বাদ পায়।
সন্তানের হাসিতে নিজের সুখ খুঁজে নেয়, সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম সাফল্য,সবকিছুতেই নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণের চেষ্টা করে।
সন্তানরা যতদিন ছোট থাকে, তাদের মানুষ করার ব্যস্ততায় দিন কেটে যায়, তখন নিজের সুখ-দুঃখ নিয়ে ভাবার সময়ও থাকে না। জীবন হয়ে ওঠে দায়িত্ব আর সংগ্রামের সমন্বয়।
তারপর একসময় সন্তান বড় হয়ে যায়।
যে সন্তানকে কোলে নিয়ে মানুষ রাত জেগেছে, যে সন্তানের জন্য নিজের ইচ্ছাগুলো বিসর্জন দিয়েছে, সেই সন্তান একদিন নিজের পৃথিবী গড়ে নেয়। এটাই জীবনের নিয়ম।
আর তখন মানুষ আবার নিজেকে প্রশ্ন করে—
“এতদিন যে সুখের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সেটাই কি সত্যিকারের সুখ ছিল?”
আসলে পৃথিবীর কোনো সুখই চিরস্থায়ী নয়।
সুখ আসে, আবার চলে যায়। দুঃখও আসে, সেটাও একসময় ফুরিয়ে যায়।
হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য এটাই, সুখ কোনো গন্তব্য নয়, সুখ হলো পথ চলার কিছু মুহূর্ত। কিছু প্রিয় মুখ, কিছু স্মৃতি, কিছু ভালোবাসা, কিছু ত্যাগ, কিছু অশ্রু আর কিছু হাসির নামই জীবন।
মানুষ শেষ বয়স পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে।
কারণ স্বপ্নহীন মানুষ বাঁচতে পারে না। আশা হারিয়ে গেলে জীবনও তার অর্থ হারিয়ে ফেলে।
তাই হয়তো সুখ খুঁজে বেড়ানোর চেয়ে সুখের মুহূর্তগুলোকে অনুভব করাই বেশি জরুরি।
কারণ একদিন সবকিছু ফেলে চলে যেতে হবে। থেকে যাবে শুধু কিছু স্মৃতি, কিছু ভালোবাসা, আর মানুষের জন্য করা কিছু ভালো কাজ।
জীবন আসলে সুখ খোঁজার গল্প নয়,
জীবন হলো অপূর্ণতার মাঝেও বেঁচে থাকার নাম।
জীবন হলো হারিয়ে ফেলেও আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার নাম।
জীবন হলো আশা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পথ চলার নাম…