নিউজ ডেস্ক
জাতিসংঘ হতে বাংলাদেশের অভিনেতা জায়েদ খানের পুরুষ্কার প্রাপ্তির বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে এর সত্যতা যাচাই-বাছাই শুরু করে সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করা প্রভাবশালী ইংরেজী পত্রিকা ব্লিটজ। বিষয়টি জানতে জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করে তারা।
প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকা ব্লিটজ-এর অনুসন্ধানে চিত্রনায়ক জায়েদ খানের জাতিসংঘের কাছ থেকে কথিত পুরুস্কার পাওয়ার বিষয়ে আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেড়িয়ে এসেছে। এরই মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো -বাইডেন সহ জাতিসংঘের নাম ব্যবহার করায় ইন্সটিটিউট অফ পাবলিক পলিসি এন্ড ডিপ্লোমেসি রিসার্চ নামীয় ভূঁইফোড় সংগঠনটির বিষয়ে তদন্তে নেমেছে মার্কিন গোয়েন্দারা।
ইন্সটিটিউট অফ পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি রিসার্চ’ (IPPDR) নামের এই ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানটি মূলত একটি অলাভজনক সংস্থা যার অবস্থান নিউইয়র্কে এবং ঠিকানা হলো- ৭৩৩ তৃতীয় এভিনিউ, স্যুইট নং ১৬৮৬, নিউইয়র্ক, এনওয়াই ১০০১৭, ইউনাইটেড স্টেটস্। বাংলাদেশের চিত্র নায়ক জায়েদ খানকে দেয়া পুরস্কারের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে খবরের শিরোনাম হয়ে অনেকের নজরে আসে। যদিও আমাদের স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিল যে আইপিপিডিআর বাংলাদেশের অভিনেতা জায়েদ খান সহ ৪০ জনকে পুরুষ্কৃত করেছে, তবে মাত্র দুজন ছাড়া আইপিপিডিআর ওয়েবসাইট বা অন্য কোনও মিডিয়া আউটলেটে পুরুষ্কারপ্রাপ্তদের কোনও গ্রুপ ছবি পাওয়া যায়নি ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আরো বলা হয়েছিলো, “৪০ জন পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন”।
কিন্তু ব্লিটজ-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে তারা বলেছে, তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি বিষয়টিকে ক্রস চেক করেছেন এবং এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমানিত হয়েছে।
ব্লিটজ আইপিপিডিআর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যাদি যাচাই করতে পুরস্কার প্রাপ্তদেরকে আলাদা আলাদা ইমেল পাঠিয়েছে এবং তারা ওই ইভেন্ট-এ যোগ দিয়েছে কিনা তা জানতে চেয়েছে।
এদিকে স্থানীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি রিসার্চ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছেন।
তবে ব্লিটজ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, তাদের পাঠানো ইমেলের জবাবে জাতিসংঘ (ইউএন) স্পষ্টভাবে বলেছে, আইপিপিডিআর বা বাংলাদেশের অভিনেতা জায়েদ খানকে দেওয়া পুরস্কারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এতে আরও বলা হয়, ‘ইন্সটিটিউট অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি রিসার্চ’ জাতিসংঘের সাথে সম্পৃক্ত নয়। প্রেসিডেন্ট জো-বাইডেন কোনো শুভেচ্ছাবার্তা পাঠাননি। এমনকি হোয়াইট হাউজের কোনো কর্মকর্তাও এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানে না।
ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোমেসি রিসার্চ- এর ওয়েবসাইট উল্লেখিত তথ্য অনুসারে, সংস্থাটি নিজেদেরকে একটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এরা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সুশাসন, নেতৃত্ব এবং সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি একাডেমিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদরকে উল্লেখ করেছে।
ব্লিটজ তাদের প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করেছে যে, IPPDR নামীয় সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ড. এন্ড্রিস বেস ও আন্তর্জাতিক পরিচালক হিসেবে ফ্রেডরিক অর্ডিন্স এর নাম পাওয়া গেছে। এই দু’জন ছাড়া আর কারও এই ভুইফোড় সংগঠনের সাথে সম্পৃক্তার উল্লেখ নেই। তার মানে এটি এই দুজনের ই একটি কথিত প্রতিষ্ঠান।
সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের অভিনেতা জহিরুল ইসলাম জায়েদ খানসহ ৪০ জনকে “পুরুষ্কার” প্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করে তাদের পরিচয় দিয়েছে। এর মধ্যে ইসাবেল ভ্লাডেইউকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ এবং ইউএস ইন্সটিটিউট অফ ডিপ্লোম্যাসি এন্ড হিউম্যান রাইটস্ এর স্বপ্নদর্শী হিসেবে উল্লেখ করেছে। পুরুষ্কার প্রাপ্ত ম্যানুয়াল ওনসিয়া যাকে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে একজন বিখ্যাত উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে এবং উল্লেখ করা হয়েছে ম্যানুয়াল ওনসিয়া ২০২৩ সালের মার্চ মাসে দ্যা ফেডারেশন অফ ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড লাভ থেকে ‘কি টু দ্য হার্ট’ পুরস্কার পেয়েছিলেন, যা USDGR-এর অর্থপ্রদানের প্রেস রিলিজের গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু ‘ব্লিটজ’ জানায় এই প্রেস রিলিজটি তাদের ওয়েবসাইট ছাড়া বিশ্বের অন্য কোনো সংবাদপত্র বা অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রকাশ করেনি।
ব্লিটজ প্রতিবেদন হতে জানা গেছে আইপিপিডিআর সংস্থাটি এখন ‘দ্য প্রেসিডেন্টস্ ভলান্টিয়ার সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ নামে আরেকটি পুরস্কার প্রকল্পও চালাচ্ছে, যদিও এর সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউসের কোনো সম্পর্ক নেই। এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত আইপিপিডিআর-এর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি নিউইয়র্ক সিটির মিডটাউন ম্যানহাটনে অবস্থিত জাতিসংঘের প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্পত্তিটি ১৯৬৭ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন বিদেশীদের সরকারী-বেসরকারি অফিস ভাড়া নেওয়ার সুযোগ আছে, অনেক ব্যবসায়িক বা অব্যবসায়িক, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এখানে ভাড়ায় রয়েছে। একইভাবে বিতর্কিত আইপিপিডিআর-এর পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি ওই ভবনে হল ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।